ঢাকা
২৩শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ১২:৫২
logo
প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৫, ২০২৬

ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্ট বনাম ফাঁকা ড্রয়িংরুম: প্রযুক্তির দখলে সম্পর্কের রিমোট কন্ট্রোল

সন্ধ্যার শেষ আলো নামার সঙ্গে সঙ্গে কিশোর তানভীর জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। নিচে ঢাকা শহর—হর্ন, আলো, মানুষের স্রোত। হাতে তার স্মার্টফোন, স্ক্রিনে ভেসে ওঠে নোটিফিকেশনের আলো—মেসেজ, রিল, লাইক। ক্লাস নাইনের ছাত্র তানভীরের বন্ধু তালিকায় সংখ্যা কম নয়; পকেটে থাকা ডিজিটাল দুনিয়ায় তার ‘বন্ধু’ একশোরও বেশি। তবু দিনের শেষে বুকের ভেতর জমে থাকে এক অদ্ভুত শূন্যতা। মোবাইলের আলো বন্ধুত্বের বৃত্ত আঁকে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবের উষ্ণ স্পর্শ সেখানে অনুপস্থিত। এই একাকীত্ব বিলাসী নয়, বরং নিঃশব্দ—যেখানে কিশোর বয়সের প্রশ্নগুলো উত্তর না পেয়ে ঘুরপাক খায়।

তানভীর একা নয়। বাংলাদেশে জানুয়ারি ২০২৪-এ সক্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৫২.৯০ মিলিয়ন—মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, দেশের প্রায় প্রতিটি ঘরেই এখন স্মার্টফোন আছে; ডিজিটাল বাতাস ঢুকে পড়েছে ড্রয়িংরুম থেকে শোবার ঘর পর্যন্ত। কিন্তু এই সর্বব্যাপী সংযোগ কি মানুষকে কাছে এনেছে? তানভীরের অভিজ্ঞতা বলে—সবসময় নয়। প্রযুক্তি মানুষের হাতের দূরত্ব কমালেও, মনের দূরত্ব অনেক সময় আরও বাড়িয়ে দেয়। “সংযুক্ত” থাকার এই যুগে সম্পর্ক যেন ক্রমশ শব্দহীন, স্পর্শহীন হয়ে উঠছে।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে তানভীর ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। চোখে পড়ে হাসিমুখের সেলফি, গেমিং লাইভ, সেলিব্রিটির ঝলক। অথচ গবেষণা জানায়, এই দৃশ্যমান আনন্দের ভিড়ের আড়ালে জমে আছে বিষণ্ণতা। রাজশাহীতে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তরুণদের একটি বড় অংশ মাঝারি থেকে গভীর মানসিক বিষণ্ণতায় ভুগছে, যার সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানোর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে যারা সেলিব্রিটি বা গেমিং কনটেন্ট বেশি অনুসরণ করে, তাদের মানসিক চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি। স্মার্টফোন আসক্তি—যাকে গবেষকরা ‘Problematic Smartphone Use’ বলছেন—কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগ, ঘুমের ব্যাঘাত এবং আত্মমর্যাদাবোধের ক্ষয় ঘটাচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রেই এটি পড়াশোনার মনোযোগ নষ্ট করছে, আচরণে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।

রাত গভীর হলে তানভীর ফোন নামিয়ে রাখে। ঘরে নীরবতা নামে, কিন্তু তার ভেতরের প্রশ্নগুলো আরও স্পষ্ট হয়। নাপোলিয়নক্যাটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন দেখায়—বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও, সেখানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য ও মানসিক ঝুঁকি সমানতালে বেড়েছে। ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক বা লিঙ্কডইন—সব প্ল্যাটফর্মেই সংখ্যার সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে মানসিক চাপের দীর্ঘ ছায়া। তানভীরের গল্প তাই কেবল একজন কিশোরের নয়; এটি একটি প্রজন্মের নীরব আর্তি—যে প্রজন্ম ভার্চুয়াল ভিড়ে দাঁড়িয়ে বাস্তব সংযোগের খোঁজে এখনও পথ হারিয়ে ফিরছে।
সুকান্ত ভট্টাচার্য - "বন্ধু" কবিতার কিছু অংশ (সংক্ষেপে অনুবাদ বা অনুপ্রেরণা):
বন্ধুরে, এখন তো আছি পাশে,
মনের মাঝে নীরবতা নেমেছে।
টাচস্ক্রিনে আঙ্গুল চলে যায়,
হৃদয় স্পর্শ মুছে গেছে।

যদি বন্ধুত্বের ক্ষয় অব্যাহত থাকে, তবে মানসিক অসুস্থতার মহামারি দেখা দিতে পারে। WHO–এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের যুব সমাজে উদ্বেগ এবং বিষণ্ণতায় ১৮.৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ভুগছেন। স্ক্রিনে অতিরিক্ত সময় বিনিয়োগে শ্রেণিকক্ষ থেকে অফিস কক্ষে মনোযোগ বহুলাংশে হ্রাস পাবে, পারিবারিক সেতু ছিন্ন হবে, আর বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা ঝ্রাস পাবে। আগামী দশকে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার চাহিদা বাড়বে, চিকিৎসার ব্যয় বেড়ে যাবে, ও সামাজিক সমন্বয় ভেঙে পড়বে। PSU–র সাথে ADHD–র সংযোগ শিক্ষাজীবনেও বিভ্রান্তি ছড়াবে, ফলশ্রুতিতে সৃষ্টিপ্রসূত সমৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘গ্রামীণ ফোন লেডি’ উদ্যোগ একসময় প্রত্যন্ত গ্রামবাংলায় কেবল টেলিযোগাযোগ সেবা পৌঁছে দেয়নি; এটি মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সামাজিক সম্পর্কের সেতুও নির্মাণ করেছিল। একটি মোবাইল ফোন হয়ে উঠেছিল শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়, বরং আস্থা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার প্রতীক। তাঁর প্রবর্তিত “সোশ্যাল বিজনেস” দর্শন স্পষ্ট করে দেখিয়েছে—যখন প্রযুক্তি মুনাফাকেন্দ্রিকতার সীমা অতিক্রম করে মানবিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সামাজিক অন্তরায় ভাঙা সম্ভব হয়। এই ধারাবাহিকতায়, ইউনূসের Social Business Accelerator–এ সম্প্রতি মানসিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও সহায়তামূলক প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ শুরু হয়েছে, যেখানে কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, সংলাপ ও বন্ধুত্বের উষ্ণতা পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।

বন্ধুত্বের ক্ষয় অনেক সময় দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তার প্রভাব গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী—এটি মানুষের অন্তর্গত শূন্যতাকে ক্রমশ প্রকট করে তোলে। ইউনূসের মানবকেন্দ্রিক প্রযুক্তি ও সামাজিক উদ্যোগগুলো এই সত্যটিই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, নিছক ডিজিটাল সংযোগ নয়, বরং সহমর্মিতা-নির্ভর যোগাযোগই পারে একাকীত্বের দেয়াল ভাঙতে। সঠিক নকশায় প্রয়োগ করা প্রযুক্তি মানুষের দূরত্ব বাড়ায় না; বরং তা সম্পর্কের নতুন ভাষা নির্মাণ করে। যেখানে প্রযুক্তির আলো মানবিক স্পর্শে দীপ্ত হয়, সেখানে একাকীত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয় না—বন্ধুত্ব সেখানে কেবল টিকে থাকে না, বরং সময়ের সাথে আরও গভীর ও অর্থবহ হয়ে ওঠে। “যেখানে প্রযুক্তির আলোতে মানবিক স্পর্শ জ্বলে ওঠে, সেখানেই একাকীত্ব পলে না—বন্ধুত্ব অমলিন হয়।”

লেখক
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

দাউদ ইব্রাহিম হাসান
মাস্টার্স শিক্ষার্থী
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +880 2-8878026, +880 1736 786915, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram