ঢাকা
২৩শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
সকাল ৭:০৯
logo
প্রকাশিত : জানুয়ারি ৪, ২০২৬

পৈশাচিক রাজনৈতিক নিপীড়নই কি খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কারণ?

"শোনো রে ঘাতক, শোনো রে স্বৈরাচার—তোমরা কি ভেবেছিলে লোহার শিকল দিয়ে আটকে রাখা যায় এক অবিনাশী কণ্ঠস্বর? তোমরা কি ভেবেছিলে গৃহবন্দি করে নিভিয়ে দেওয়া যায় সেই শিখা, যা জ্বলে উঠেছিল কোটি প্রাণের স্পন্দনে? ভুল করেছিলে তোমরা! আজ সেই সিংহী যখন মহানিদ্রায়, তাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাস এখন একেকটি আগ্নেয়গিরি হয়ে ফিরে আসবে। তোমরা তাঁকে রাজপথ থেকে সরাতে পারোনি, কারাগার দিয়ে দমাতে পারোনি, এখন মৃত্যুকে দিয়েও কি তাঁর আদর্শকে মুছে ফেলবে? অসম্ভব! কারণ খালেদা জিয়া কোনো দেহের নাম নয়, খালেদা জিয়া হলো একটি মানচিত্রের অবিনাশী দম্ভ!"

শীতের এই হাড়কাঁপানো ভোরে বাংলাদেশের আকাশে যে সূর্যটি উঁকি দিয়েছে, সেটি যেন রক্তিম নয়, বরং শোকের কালো চাদরে মোড়ানো। রাজধানীর নিভৃত কেবিনে যখন এই অকুতোভয় নারীর হৃৎস্পন্দন চিরতরে থেমে গেল, তখন বাংলার প্রতিটি নদীর স্রোত যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। ১৯৪৫ সালের সেই মহেন্দ্রক্ষণে জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি দিন ছিল আগুনের সাথে খেলা। স্বামীর রক্ত মাখা শাড়ি পরে যিনি রাজনীতির কঠিন পিচে পা রেখেছিলেন, আজ তিনি বিদায় নিলেন এক বুক নীল কষ্ট আর একরাশ উপেক্ষা নিয়ে। এই বিয়োগান্তক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে প্রতিটি বাঙালি ডুকরে কাঁদছে; কারণ তারা হারিয়েছে সেই মাকে, যিনি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করতে শেখাননি। তাঁর এই প্রস্থান কেবল একটি মানুষের চলে যাওয়া নয়, বরং একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ার মতো এক হাহাকার।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন মানেই হলো রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র আর পৈশাচিক নিপীড়নের এক দীর্ঘ ফিরিস্তি। আমরা ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে জানতে পারি যে, ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাহাদাতের পর থেকেই তাঁকে দমনের নীল নকশা শুরু হয়। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তাঁকে শুধু সাতবার গৃহবন্দিই করা হয়নি, বরং প্রতিবার তাঁর ওপর চালানো হয়েছে অসহনীয় মানসিক চাপ। ১৯৮৩ সালে তাঁর প্রাথমিক কারাবাস থেকে শুরু করে ১৯৮৭ সালে হোটেল পূর্বাণীর সেই রক্তক্ষয়ী হামলায় তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা—প্রতিটি ঘটনাই আমাদের ইঙ্গিত দেয় যে, তাঁকে সরাতে পারলেই স্বৈরতন্ত্রের পথ পরিষ্কার হতো। আমরা সকলেই জানি, ১৯৯০ সালের সেই রাজপথের লড়াকু সৈনিককে থামাতে ১৯৮৪ সালে তাঁকে অন্তত দুবার নির্জন স্থানে আটক রাখা হয়েছিল। এই প্রতিটি তথ্য প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল ক্ষমতার জন্য নয়, বরং জনগণের ভোটাধিকারের জন্য নিজের ব্যক্তিজীবনকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। বাঙালি জাতি এখান থেকে লাভ করল এক অবিনাশী সাহস, যা আজও আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রতীক হয়ে আছে।

নিপীড়নের সেই জয়যাত্রা থেমে থাকেনি আধুনিক আমলেও। ২০০৭ সালের ১/১১-এর সেই অভিশপ্ত ভোরে যখন মইন-ইউ-ফখরুদ্দীন সরকার তাঁকে সাব-জেলে বন্দি করে, তখন থেকেই শুরু হয়েছিল এক নব্য ফ্যাসিবাদের সূচনা। টানা ৩৭০ দিন সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তাঁকে সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এর পরবর্তী দশকে যে অমানবিকতার বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি, তা কোনো গণতান্ত্রিক দেশে কল্পনা করাও দায়। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর তাঁর দীর্ঘ ৪০ বছরের মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে তাঁকে একবস্ত্রে টেনেহিঁচড়ে বের করার সেই দৃশ্যটি আজও প্রতিটি বাঙালির চোখে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এটি কেবল একটি উচ্ছেদ ছিল না, এটি ছিল একজন জাতীয় নেত্রীর সম্মানে করা কুঠারাঘাত। এই ঘটনা আমাদের এই ইঙ্গিত দেয় যে, প্রতিহিংসার রাজনীতি কত নিচু স্তরে নামতে পারে। বাঙালি জাতি তাঁর এই অপমান থেকে শিখল যে, নিজের অধিকার রক্ষা করতে হলে নিজের কণ্ঠস্বরকে আরও তীব্র করতে হয়।

২০১৫ সাল ছিল তাঁর জীবনের এক অন্যতম অগ্নিপরীক্ষা। টানা ৯৩ দিন গুলশান কার্যালয়ে তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। আমরা জানি যে, সেই সময় সেই কার্যালয়ের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি পচা গন্ধ ছড়ানোর জন্য সেখানে আবর্জনা স্তূপ করা হয়েছিল এবং মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে তাঁর কর্মীদের শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এটি ছিল এক বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। এর মাঝেই তাঁর ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যুতে তাঁর মা হিসেবে শোক প্রকাশ করার ন্যূনতম সুযোগটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর জানাজায় যাওয়ার জন্য তাঁকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল—এক জননীর জন্য এর চেয়ে বড় অত্যাচার আর কী হতে পারে? এই নিষ্ঠুর ডাটাগুলো আমাদের ইঙ্গিত দেয় যে, ফ্যাসিবাদের কোনো হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।

প্রামাণ্য তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট মামলায় তাঁকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সেই সাজা দ্বিগুণ করে ১০ বছর করা এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আরও ৭ বছরের সাজা দেওয়া ছিল আইনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাঁকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। কারাগারে থাকাকালীন তাঁর যথাযথ চিকিৎসার অভাব এবং তাঁকে বিদেশের উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা ছিল এক সুপরিকল্পিত শারীরিক নিধনের চেষ্টা। এভারকেয়ার হাসপাতালের কেবিনে যখন তিনি লিভার সিরোসিস ও হার্ট ব্লকের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন, তখনও তাঁর অপরাধ ছিল—তিনি দেশের মানুষের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস করেননি। তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানের নির্বাসন আর নিজের একাকীত্বের যন্ত্রণা প্রতিটি বাংলাদেশি মায়ের হৃদয়কে আজ ডুকরে কাঁদাচ্ছে। বাঙালি জাতি তাঁর এই ব্যক্তিগত ত্যাগের বিনিময়ে লাভ করেছে এক অকুতোভয় নেত্রীর অবিচল ছায়া।

এত নিপীড়নের মাঝেও তাঁর রাজনৈতিক অবদান ছিল আকাশচুম্বী। ১৯৯১ সালে সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তন, ১৯৯৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলককরণ এবং ছাত্রীদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালু করে তিনি এ দেশের নারী জাগরণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। আজ আমাদের যে নারীরা বিশ্বমঞ্চে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, সেই বিপ্লবের কারিগর ছিলেন এই জননীই। যমুনা বহুমুখী সেতুর কাজ সফলভাবে সমাপ্ত করে উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘব করেছিলেন। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য; কম্পিউটার আমদানিতে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং সাবমেরিন ক্যাবল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার সিদ্ধান্তটি ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যার সুফল আজ বাংলাদেশের কোটি তরুণ ফ্রিল্যান্সার ভোগ করছে। বাঙালি জাতি তাঁর অর্থনৈতিক দর্শন থেকে লাভ করেছে স্বাবলম্বী হওয়ার মন্ত্র।

পরিশেষে, বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্থান মানে একটি মহাকাব্যের শেষ পাতাটি ছিঁড়ে যাওয়া। তিনি মরেও বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের প্রতিটি জাতীয়তাবাদী স্পন্দনে। যে মাটি থেকে তিনি উঠে এসেছিলেন, সেই মাটির কোলেই আজ তিনি পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকবেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ যে অমূল্য এক খনিকে হারাল, তার শূন্যতা পূরণ করার সাধ্য এই মহাকালেরও নেই। হে মাদার অব ডেমোক্রেসি, আপনি শান্তিতে ঘুমান। আপনার অজেয় হাসি ছিল আমাদের ভরসা, আর আপনার নীরবতা ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আপনি শিখিয়ে গেছেন, শাসক পালালেই ফ্যাসিবাদ যায় না, যদি না মানুষ মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শেখে। আপনার এই ক্ষতবিক্ষত জীবনই হবে আগামী দিনের বিদ্রোহী তরুণদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।

"শোনো রে বাঙালি, যে মা শিখিয়েছিলেন মাথা নত না করার দম্ভ, তিনি আজ চলে গেলেন এক বুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে; আমাদের প্রতিটি চোখের জল যেন শপথ হয়ে ফিরে আসে প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, কারণ শহীদের রক্ত আর মায়ের চোখের জল কখনো বিফলে যায় না!"

লেখক
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব
সহকারী অধ্যাপক
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

দাউদ ইব্রাহিম হাসান
মাস্টার্স শিক্ষার্থী
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +880 2-8878026, +880 1736 786915, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram