

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামগঞ্জে কিংবা শহরের খালি মাঠে খেলাধুলা। একসময় বিকেল হলেই গ্রামের বিশাল খেলার মাঠ কিংবা শহরের গলির মোড়গুলো মুখরিত হয়ে উঠত কিশোর-কিশোরীদের কলকাকলিতে। ফুটবল, ক্রিকেট থেকে শুরু করে হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা কিংবা কানামাছিসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোতে মেতে থাকত সবাই। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন ডুমুরের ফুল। মাঠের সেই প্রাণবন্ত কোলাহল এখন ফিকে হয়ে আসছে, আর তার জায়গা দখল করে নিয়েছে হাতের মুঠোয় থাকা একটি স্মার্টফোন।
আধুনিক নগরায়ন এবং প্রযুক্তির জোয়ারে শৈশবের সেই উন্মুক্ত খেলার মাঠগুলো এখন সংকুচিত হয়ে আসছে। অনেক জায়গায় মাঠ দখল করে তৈরি হচ্ছে বহুতল ভবন। তবে মাঠ থাকলেও সেখানে খেলোয়াড়ের অভাব প্রকট। আগে যেখানে এক মাঠেই ৩-৪টি গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলা হতো, এখন সেখানে ঘাস বড় হয়ে জঙ্গল তৈরি হচ্ছে। বিকেলবেলা মাঠে যাওয়া এখন অনেক শিশুর কাছে একঘেয়েমি বা ক্লান্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাঠের খেলাধুলা কমে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা ও ইন্টারনেটের বিস্তার। এখনকার শিশুদের বিকেল কাটে ঘরের কোণে বসে—ফ্রি ফায়ার, পাবজি কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করে।
দৌড়ঝাঁপ না করায় শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। দলগতভাবে খেলার মাধ্যমে যে ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক দক্ষতা তৈরি হতো, একা একা মোবাইল ব্যবহারের ফলে তা হারিয়ে যাচ্ছে। একটানা মোবাইল দেখার ফলে চোখের সমস্যা, স্থূলতা (ওজন বেড়ে যাওয়া) এবং মানসিক অবসাদ বাড়ছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, "মাঠের খেলাধুলা কেবল শরীর গঠন করে না, এটি শিশুর চারিত্রিক দৃঢ়তা ও ধৈর্যশীলতা শেখায়। মোবাইল গেমসে দ্রুত জয়ী হওয়ার প্রবণতা শিশুদের মধ্যে উগ্রতা ও অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।"
অভিভাবকদের অনেকেই আক্ষেপ করে বলছেন যে, পড়াশোনার চাপ আর নিরাপদ পরিবেশের অভাবে তারাও অনেক সময় বাচ্চাদের ঘরের ভেতর আটকে রাখছেন, যা তাদের মোবাইলের দিকে আরও বেশি ঠেলে দিচ্ছে।
কেবল প্রযুক্তির ওপর দোষ না চাপিয়ে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নিশ্চিত করা এবং তাদের সঙ্গে সময় কাটানো জরুরি। পাড়ায় পাড়ায় খেলাধুলার আয়োজন এবং টুর্নামেন্টের ব্যবস্থা করলে শিশুরা পুনরায় মাঠের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। প্রযুক্তির পরিমিত ব্যবহার এবং মাঠের ধুলোবালির সাথে বেড়ে ওঠার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি সুস্থ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। মাঠের খেলাধুলা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
লেখক
পিন্টু দেবনাথ, সম্পাদক ও প্রকাশক
কমলকুঁড়ি পত্রিকা
সহ-সভাপতি
কমলগঞ্জ প্রেসক্লাব, মৌলভীবাজার
মোবাইল : ০১৭১৬৩৬২৯৪৪, ই-মেইল : pintupress@gmail.com

