

তেজোদ্দীপ্ত নেতৃত্ব, দৃঢ় প্রশাসনিক অবস্থান ও আপন কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখা- যাঁর নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, তিনি হলেন ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ২০০১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যে প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও স্বচ্ছতার নজির স্থাপন করেছিলেন, তা আজও দেশের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। তাঁর সময়ে নকল, প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হওয়াসহ শিক্ষা প্রশাসনের নানা অনিয়ম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছিল—যা ছিল এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
এরপর দীর্ঘ প্রায় দুই দশক জাতিকে শিক্ষা ক্ষেত্রে কাটাতে হয়েছে এক ধরনের দিশাহীনতার মধ্যে। শিক্ষানীতি ও বাস্তবতার মাঝে বিস্তর ফারাক, দায়িত্বহীনতা, সংস্কৃতির নামে অবক্ষয় আর প্রশাসনিক উদাসীনতায় শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়ে খেলাচ্ছলে চালিত এক ভঙ্গুর কাঠামো। এর ফলে সামাজিক অবক্ষয় যেমন বেড়েছে, তেমনি শিক্ষার গুণগত মানও ক্রমাগত নেমেছে তলানিতে। প্রতিটি পর্যায়ে আমরা বারবার অনুভব করেছি—একজন দৃঢ় ও অভিজ্ঞ শিক্ষানেতার শূন্যতা।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, নানা অস্থিরতা ও ‘মব-তন্ত্র’(উশৃংখল জনতাতন্ত্র) পেরিয়ে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে যখন তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হলো, তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ড. এহছানুল হক মিলনের প্রত্যাবর্তনের দাবি জোরালো হতে থাকে। অবশেষে সেই প্রত্যাশার বাস্তবায়ন ঘটেছে। বয়সের ভার থাকলেও জাতির বিশ্বাস—তাঁর অভিজ্ঞতা ও দৃঢ়তায় আবারও শিক্ষা খাতে গতি ফিরবে।
শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র: প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত ও করুণ ফলাফল-
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির আত্মত্যাগে অর্জিত স্বাধীনতার পথচলা শিক্ষা ক্ষেত্রে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে অপরিকল্পিত ও বাস্তবতাবিবর্জিত সিদ্ধান্তে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ১৯৩টি রেজিস্ট্রার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ। মেট্রিক বা ইন্টার পাস করে, কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ছাড়াই যারা শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশ করেছিলেন—তাদের বড় একটি অংশ আজও পাঠদানে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারেননি। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান ও নিরীক্ষায় দেখা গেছে, এসব শিক্ষক প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম রিডিং স্কিলও নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।
প্রক্সি নিয়োগ ও প্রশাসনিক শৈথিল্য:
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত দেড় যুগে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধেও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ—প্রক্সি পরীক্ষার মাধ্যমে চাকরি পাওয়া। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় এমন ঘটনাও রয়েছে, যেখানে পরীক্ষার্থী নিজে পরীক্ষাকেন্দ্রে না গিয়েও উত্তীর্ণ হয়েছেন। ফলশ্রুতিতে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে বাংলা-ইংরেজি পাঠে চরম দুর্বলতা দেখাচ্ছে।
আরও ভয়াবহ চিত্র হলো—কোথাও শিক্ষক আছে, শিক্ষার্থী নেই; কোথাও প্রতিষ্ঠানই নেই, অথচ বেতন উত্তোলন চলছে নিয়মিত। হাতিয়া উপজেলার হাজী গিয়াসউদ্দিন ও মাকছুদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে বহুল আলোচিত উদাহরণ।
মাধ্যমিক স্তরের রুগ্নতা ও বাণিজ্যিকীকরণ:
মাধ্যমিক স্তরের অবস্থাও আশাব্যঞ্জক নয়। পড়াশোনার পরিবর্তে গড়ে উঠেছে গ্রেড বাণিজ্য। প্রভাবশালী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভালো ফল করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু উচ্চতর প্রতিযোগিতায় গিয়ে তারা অধিকাংশই ঝরে পড়ছে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—উভয়ের মধ্যেই বাড়ছে হতাশা।
ছুটির রাজনীতি ও শিক্ষার ক্ষতি:
গত কয়েক বছরে অকারণ ছুটিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বারবার বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের ক্ষতি চরম আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ বুধবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নোটিশে বৃহস্পতিবার থেকেই রমজান মাসের ছুটি ঘোষণা করা হয়।
শিক্ষাবিদদের মতে, অন্তত রমজানের ১৫ তারিখ পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখা যেত। ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় ছুটি বাতিল করাও সময়ের দাবি।
মূল সমস্যার উৎস ও উত্তরণের পথ: সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপে উঠে এসেছে—
শিক্ষকদের প্রাইভেট-কোচিং ও বাণিজ্যিক মানসিকতার ফলে শ্রেণি কার্যক্রমে তাদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার অভাবে শিক্ষার্থীদের মনোজগতে প্রবেশ করতে না পারা ও শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকর তদারকির অভাবে গতিশীল শিক্ষার বড় বাধা। এছাড়া উপবৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অবৈধ ফি আদায়ের রীতি দুর্নীতির মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে- যা শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
সংশ্লিষ্ট বিভাগে কর্মকর্তার অনুপস্থিতি:
সংশ্লিষ্ট বিভাগে কর্মকর্তার লাগাতার অনুপস্থিতি চলমান কাজে বাধা সৃষ্টি হয়। গত তিন বছর ধরে হাতিয়ায় কোনো মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নেই। ফলে প্রশাসনিক অচলাবস্থা চরমে। ২০২৩ সালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে কর্মকর্তা বদলি হওয়ার পর আর কেউ যোগ দেননি। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নামমাত্র অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকলেও মাসের পর মাস উপজেলায় না আসায় পুরো বিভাগ চলছে হিসাব সহকারীর উপর নির্ভর করে।
জাতির প্রত্যাশা:
আমরা বিশ্বাস করি, ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সততা, অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে এই ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সম্ভব। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক—সব স্তরে জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠবে—এই প্রত্যাশায় জাতি আজ আশাবাদী।
শিক্ষা হোক আলোকিত ভবিষ্যতের প্রধান ভিত্তি—এই কামনায় শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি রইল জাতির পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।
লেখক
ছায়েদ আহামেদ
সাংবাদিক
হাতিয়া, নোয়াখালী

