

“ঈদের দ্বিতীয় দিন দুপুরে হাসপাতালের খাবারে পচা মুরগির মাংস দেওয়া হয়। ওই মাংস খেয়ে আমি বমি করি। অনেক রোগী অসুস্থ হয়ে পড়েন।
“রোগীরা এমনিতেই শারীরিক কষ্টে থাকেন। এর মধ্যে নিম্নমানের খাবার তাদের জন্য আরও ঝুঁকির কারণ হতে পারে।” কথাগুলো বলছিলেন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিকস ওয়ার্ডের রোগী রায়হান।
দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের খাবারের নিম্নমান নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরেই রোগী ও স্বজনদের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযোগ আসছে।
সম্প্রতি হাসপাতালে গিয়ে বিভিন্ন রোগীর সঙ্গে কথা বললে, ‘‘সেই পুরোনো অভিযোগগুলোই আবারও সামনে আসে।
তবে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক কাজী মো. আইনুল ইসলামের ভাষ্য, “হাসপাতালে জনবল সংকটসহ অনেক সমস্যা রয়েছে যেগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।”
নগরের বয়রা এলাকায় ১৯৮৯ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট খুলনা হাসপাতাল। যা ১৯৯২ সালে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়।
অধিক রোগীর চাপে ২০০৮ সালে হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ১৬টি বিভাগের আওতাধীন ৩১ ওয়ার্ডে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয় এখানে।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ৫০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও বর্তমানে প্রতিদিন এখানে প্রায় দেড় হাজার রোগী ভর্তি থাকছে। পাশাপাশি বহির্বিভাগে আরও ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
হাসপাতালটির নানামুখী সমস্যার মধ্যে রান্নাঘরের পরিবেশ ও খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদের দাবি, হাসপাতালের খাবার মানসম্মত নয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা খাওয়ার উপযোগী থাকে না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক রোগী বাইরে থেকে খাবার কিনে আনেন।
এ বিষয়ে চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে বারবার অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি বলেও অভিযোগ তাদের।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিবছর দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ করে হাসপাতালের রোগীদের খাবার সরবরাহ করা হয়। একজন রোগীর দৈনিক তিন বেলার খাবারের জন্য সরকারি বরাদ্দ রয়েছে ১৭৫ টাকা।
নির্ধারিত মেন্যু অনুযায়ী ডায়েট-১ এ কলা, রুটি ও ডিম, ডায়েট-২ এ দুধ এবং ডায়েট-৩ এ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অল্পসংখ্যক রোগীর জন্য উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার দেওয়ার কথা।
এ ছাড়া দুপুর ও রাতের খাবারে এক বেলা মাছ এবং অন্য বেলা ব্রয়লার মুরগির মাংস অথবা ডিম পরিবেশনের নিয়ম রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আল মাসুম খান বলছেন, “দুপুরে ব্রয়লার মুরগির মাংসের পরিবর্তে বেশিরভাগ দিনই ডিম এবং সন্ধ্যায় রুই-কাতলার পরিবর্তে কম দামের বিভিন্ন মাছ অথবা ডিম, সবজি আর পানির মত স্বচ্ছ স্বাদহীন ডালই রোগীদের দেওয়া হচ্ছে। রোগীদেরও বাধ্য হতে সেসব খাবারই গ্রহণ করতে হয়।
হাসপাতালে সরবরাহ করা নিম্নমানের চালের ভাত থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। পাশাপাশি খাবারের পরিমাণও প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় অনেক রোগীকে অতিরিক্ত খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়।”
মাসুমের ভাষ্য, নিম্মমানের খাবারের বিষয়টি হাসপাতাল প্রশাসনের অজানা নয়। প্রতিদিন রোগীর খাবারের নমুনা পরীক্ষা করার নিয়ম থাকলেও তা শুধু নিয়মেই আছে। হাসপাতালের কতিপয় কর্মকর্তা-ঠিকাদারের দুর্নীতিতে নিম্মমানের খাবারে ভোগান্তিতে থাকেন ভর্তি রোগীরা।
তার অভিযোগ, “কোরবানির ঈদের দ্বিতীয় দিন দুপুরে পচা মুরগির মাংস খাওয়ানো হয় রোগীদের। এ নিয়ে হাসপাতালজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। তখন হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে অনুপস্থিত থাকেন এবং নিজেদের দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালান।
“হাসপাতালের রান্নাঘরের পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর। মেঝে, রান্নার পাত্র সবই অপরিষ্কার। অপরিশোধিত পানি দিয়ে চলে রান্নার কাজ। খোলা অবস্থায় রেখে দেওয়া ভাত-তরকারির পাশেই দেখা যায় ঝাড়ু দিতে। রয়েছে ইঁদুর, বিড়ালের বিচরণ।”
হাসপাতালের নিচতলায় গাইনি ইউনিট-১ ওয়ার্ডে ভর্তি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার মুড়াগাছা এলাকার সাবিনা আক্তার বলেন, “আমি গত সপ্তাহে এখানে ভর্তি হয়েছি। যেদিন ভর্তি হয়েছি সেদিন খাবার পাইনি। তাছাড়া রোগীদের খাবার খাওয়ার পর থালা-বাটি ধোয়ার জন্য অধিকাংশ সময়েই হাসপাতালের ট্যাপে পানি থাকে না।
“পুরো হাসপাতালজুড়ে বিশুদ্ধ পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয় বাইরে থেকে; এটা ভীষণ কষ্টদায়ক।”
জমি-জমা সংক্রান্ত বিবাদে হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালের তৃতীয় তলায় ভর্তি আছেন খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বুনোরাবাদ এলাকার খবির শেখ।
তার অভিযোগ, “এখানে ভর্তি রোগীদের ঠিকমত খাবার দেওয়া হয় না। আবার বেলা ১২টা থেকে ১টার মধ্যে অনেক রোগী হাসপাতাল ছেড়ে যান। সেসব রোগীর খাবার বেঁচে যায়।”
এসব অবশিষ্ট খাবার কোথায় যায় তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন আলোচিত কর্মচারীর ‘নিকট আত্মীয়’ হিসেবে পরিচিত স্টুয়ার্ট (খাদ্য ব্যবস্থাপনা তত্ত্বাবধায়ক) হাবিবুর রহমান একই হাসপাতালে প্রায় সাত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন একই পদে দায়িত্বে থাকায় তিনি হাসপাতালের রান্নাঘরকেন্দ্রিক একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
তার বিরুদ্ধে রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবার সরবরাহে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, রোগীদের খাবারের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি অংশ আত্মসাতের পাশাপাশি অতিরিক্ত রোগী দেখিয়ে বিল তৈরির মাধ্যমেও অনিয়ম করা হয়।
তাছাড়া স্টুয়ার্ট হাবিবুর রহমানের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরেই হাসপাতালটির রান্নাঘর থেকে রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবার বাইরে পাচার করা হয় বলেও অভিযোগ তুলেছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. মোঝাহার আলী খান বলেন, গত ৩ জুন স্টুয়ার্ট হাবিবুর রহমানকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
মোঝাহার বলেন, ‘‘এর আগে ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর দুদক হাসপাতালের রান্নাঘরে অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানে অনিয়মের অভিযোগে হাবিবুরকে ২৫ ডিসেম্বর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে তিনি স্বাস্থ্য বিভাগের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজশে দুই মাস পর আবার স্বপদে ফিরে আসেন।’’
হাসপাতালে ‘আলহাজ্ব এ রহমান অ্যান্ড সন্স’ এবং ‘মেসার্স আল মামুন ট্রেডিং’ নামের দুইটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রোগীদের খাদ্য সরবরাহ করে জানিয়ে তিনি বলেন, “ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনের ঘটনায় ঘটনার সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।”
যদিও হাবিবুর রহমান তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন, “ঈদের দ্বিতীয় দিন আমি খুলনাতে ছিলাম না।” রান্নাঘরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির বিষয়ে জানতে চাইলে তা তিনি এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে জানতে ‘এ রহমান অ্যান্ড সন্সের’ স্বত্বাধিকারী শারমিন সুলতানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
একইভাবে মেসার্স আল মামুন ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পরই ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে তাকে একাধিকবার ফোন ও বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক আইনুল ইসলাম বলেন, “আমি ২০২৫ সালের অগাস্টে এই হাসপাতালের দায়িত্ব নেই। এর আগে স্টুয়ার্ট হাবিব এখানে কী করেছে জানি না। তবে আমি যোগদানের পর হাসপাতালের রান্নাঘর নিয়মিতই তদারকি করি।”
ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিন রোগীদের পচা মুরগির মাংস খাওয়ানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এ ব্যাপারে প্রশাসনিকভাবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় পরিচালক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, “আমি সবেমাত্র যোগদান করেছি। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সমস্যা অনেক। এগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে।”
হাসপাতালে সুপেয় পানি ও রান্নাঘরের অনিয়মের বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
সূত্র: বিডি নিউজ
