ঢাকা
logo
প্রকাশিত : August 1, 2026

মাতৃদুগ্ধ পান কমার মূল্য দিচ্ছে শিশুরা

শিশুর প্রথম টিকা, প্রথম পুষ্টি এবং প্রথম রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সবই আসে মায়ের বুকের দুধ থেকে। অথচ বাংলাদেশে সেই জীবনরক্ষাকারী মাতৃদুগ্ধ থেকে ক্রমেই বঞ্চিত হচ্ছে লাখ লাখ শিশু।

ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ২০২৫ সালের মাল্টিক্লাস্টার ইন্ডিকেটর সার্ভে (এমআইসিএস) বলছে, দেশে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ নবজাতক বুকের দুধ পায়। অন্যদিকে শূন্য থেকে পাঁচ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে শুধু মাতৃদুগ্ধ পানের হার মাত্র ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুটি শিশুর একটি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মায়ের দুধ ছাড়া অন্য খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালে শুধু মাতৃদুগ্ধ পানের হার ছিল প্রায় ৬৩ শতাংশ। সর্বশেষ জরিপে তা কমে ৫৭ শতাংশে নেমেছে। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (বিডিএইচএস) তথ্যও একই ধরনের স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পতনের মূল্য দিচ্ছে শিশুরাই।

দুর্বল হচ্ছে তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, বাড়ছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি। আজ ১ আগস্ট বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস এবং শুরু হচ্ছে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। এবারের প্রতিপাদ্য ‘টেকসই জীবনের সুদৃঢ় সূচনা : সফল উদ্যোগগুলো শক্তিশালী করি’। কিন্তু বাস্তবে মাতৃদুগ্ধ নিশ্চিত করার মৌলিক সূচকগুলোতেই পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ।

হামের ভয়াবহতায় স্পষ্ট হচ্ছে সংকট : চলতি বছর দেশে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত হামের উপসর্গে ৭৪১ শিশু এবং নিশ্চিত হামে ৯৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মোট মৃত্যু ৮৩৭। আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি শিশু।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে টিকাই প্রধান অস্ত্র। তবে টিকার পাশাপাশি শিশুর শরীরে প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে শুধু মাতৃদুগ্ধ পানের বিকল্প নেই। মাতৃদুগ্ধের ঘাটতি, অপুষ্টি এবং টিকাদানের ঘাটতি একসঙ্গে থাকলে সংক্রমণ আরো মারাত্মক হয়ে ওঠে।

মায়ের প্রথম দুধই শিশুর প্রথম টিকা : বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল বলেন, জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। শালদুধে থাকা অ্যান্টিবডি শিশুকে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়।

এই বিশেষজ্ঞের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার কমে যাওয়ায় বহু শিশুর প্রাথমিক পুষ্টিতে প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশু জন্মের পর থেকে বিকল্প খাদ্যে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় স্বাভাবিক মাতৃদুগ্ধ গ্রহণ ব্যাহত হয়। কর্মজীবী মায়েদের ক্ষেত্রে শিশুকে বুকের দুধ পান করানোর সহায়ক পরিবেশের ঘাটতি এর অন্যতম কারণ।

আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক ও হাম-রুবেলা নির্মূল মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধে টিকাদান অপরিহার্য হলেও শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করতে মাতৃদুগ্ধের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে হামের মতো সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে মাতৃদুগ্ধ গুরুত্বপূর্ণ হলেও একমাত্র নির্ধারক নয়। টিকা, পুষ্টি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যও সমানভাবে ভূমিকা রাখে। তিনি একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পান কমার পেছনে কর্মজীবী মায়েদের জন্য সহায়ক পরিবেশের অভাব, প্রচার ও সচেতনতার ঘাটতি এবং মিশ্র খাদ্যের প্রবণতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, শিশু জন্মের পর দ্রুতই ফিডার তথা দুধের বিকল্পে অভ্যস্ত হলে স্বাভাবিক মাতৃদুগ্ধ গ্রহণ ব্যাহত হয়।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই : শহরাঞ্চলে কর্মজীবী মায়ের সংখ্যা বাড়ছে; কিন্তু বেশির ভাগ কর্মস্থলে মাতৃদুগ্ধ পান করানোর অনুকূল পরিবেশ নেই। ফলে অনেক মা বাধ্য হয়ে শিশুকে গুঁড়া দুধ খাওয়াচ্ছেন।

অন্যদিকে বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ফর্মুলা দুধের আকর্ষণীয় প্রচারণা, বিভ্রান্তিকর বার্তা এবং সহজলভ্যতা বিকল্প শিশুখাদ্যের ব্যবহার বাড়িয়ে দিচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, প্রয়োজন ছাড়া ফর্মুলা দুধের ওপর নির্ভরশীলতা শিশুর স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করতে পারে। বাংলাদেশে ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য, শিশুখাদ্য ও এর সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ প্রায় নেই।

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন দোকান ও সুপারশপে দেখা যায়, বিকল্প শিশুখাদ্যের প্রচার ও প্রদর্শনে আইনের নানা বিধান উপেক্ষা করা হচ্ছে। অনেক অভিভাবকও জানেন না, মায়ের দুধের সমতুল্য কোনো খাদ্য নেই এ কথাটি আইনে বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করার বিধান রয়েছে।

শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই উদ্যোগ : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সচেতনতা দিয়ে হবে না; কর্মক্ষেত্রে মাতৃদুগ্ধবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা বৃদ্ধি, বিকল্প শিশুখাদ্যের অনিয়ন্ত্রিত বিপণন বন্ধ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আজকের অবহেলা আগামী দিনের অসুস্থ প্রজন্ম তৈরি করবে। জন্মের পর একটি শিশুর সবচেয়ে বড় অধিকার হলো মায়ের বুকের দুধ। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে মাতৃদুগ্ধ কমার মূল্য দিতে থাকবে দেশের শিশুরাই।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মায়ের দুধ নবজাতকের জন্য আদর্শ পুষ্টিকর খাবার। এতে সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণ অনেক কমে যায়। মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ঘটে পরিপূর্ণভাবে। এতে মায়েদের স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকিও কমে। জন্মের পর থেকে ছয় মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের দুধই শিশুর একমাত্র পূর্ণাঙ্গ খাবার হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল হেলথ সায়েন্সের গবেষণা অনুযায়ী, মাতৃদুগ্ধ পান শিশুমৃত্যুর হার ২০ শতাংশ কমায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুর ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, কান ও বুকের ইনফেকশন, কোষ্ঠকাঠিন্য, একজিমা, অ্যালার্জি এবং পূর্ণবয়স্ক অবস্থায় ওবেসিটি (অতিরিক্ত ওজন) ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা মাতৃদুগ্ধ না পানকারী শিশুর তুলনায় অনেক কম। তা ছাড়া মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুর বুদ্ধির বিকাশও সঠিক হয়।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram