

রাজধানীর পল্টনে অবস্থিত শারমিন একাডেমিতে ৪ বছর বয়সী এক শিশুকে নির্মমভাবে নির্যাতনের ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল- বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটা দুর্বল। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিশুদের নিরাপদ বেড়ে ওঠার কথা, সেখানেই শিশুরা ভয়, আতঙ্ক ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এই ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, এটি ক্রমেই একটি সামাজিক আতঙ্কে রূপ নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশু নির্যাতনের জন্য রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি সমাজের নীরবতাও দায়ী।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র : বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান না থাকলেও বেসরকারি গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে ৯ জনই প্রতি মাসে কোনো না কোনো ধরনের শারীরিক বা মানসিক সহিংসতা ও শাস্তির মুখোমুখি হয়। এর ফলে প্রতি মাসে সাড়ে ৪ কোটি শিশুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
জানা গেছে, চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এ প্রতি বছর সবচেয়ে বেশি ফোন আসে শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত অভিযোগে। মানবাধিকার সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলায় ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক নিপীড়নের হাজারের কাছাকাছি ঘটনা ও মামলা রয়েছে, যার অনেকগুলো এখনও বিচারাধীন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবারের ভেতরে শাস্তিমূলক আচরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার ব্যবহার এবং সমাজের নীরবতা- এই তিনটি বিষয় মিলেই শিশু নির্যাতনকে টিকিয়ে রাখছে।
নির্যাতনের ক্ষত শিশু মনে : মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবে সহিংসতার অভিজ্ঞতা শিশুর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। এতে আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়ে, ভয় ও উদ্বেগ স্থায়ী হয়ে ওঠে এবং অনেক শিশু সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি পোস্ট-ট্রম্যাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি), বিষন্নতা ও শেখার সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।
মনোবিজ্ঞানী ড. আকরা হোসনা বলেন, ‘শিশুর মস্তিষ্কে সহিংসতা এক ধরনের ক্ষতচিহ্ন তৈরি করে। এটি শুধু তাৎক্ষণিক কষ্ট নয়- ভবিষ্যতে শেখা, সম্পর্ক গড়া ও আত্মবিশ্বাসের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।’
অভিভাবক ও শিক্ষা প্রশাসনের চাওয়া : অভিভাবকরা বলছেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান শিশু সুরক্ষা নীতিমালার কঠোর প্রয়োগ জরুরি। সহিংস আচরণ, অপমানজনক ভাষা ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। অনেকেই প্রতিটি স্কুলে ‘নির্যাতন রোধ কমিটি’, কাউন্সেলিং সেল এবং অভিভাব-শিক্ষক যৌথ মনিটরিং ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন।
শিক্ষা প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শিক্ষার্থী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, আচরণগত নির্দেশনা এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান চন্দ্র রায় পোদ্দার বলেন, ‘কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক কম। তবে বিদ্যমান নীতিমালার কারণে আগের তুলনায় নির্যাতনের ঘটনা কমেছে। নজরদারি বাড়াতে পারলে আরও কমানো সম্ভব।’
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে সমস্যা : সমাজবিজ্ঞানী ড. শামিমা আক্তার মনে করেন, ‘শিশু নির্যাতন শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি সমাজের কর্তৃত্ববাদী মানসিকতা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি থেকে জন্ম নেয়। এই মানসিকতা বদলাতে না পারলে নির্যাতন বন্ধ হবে না।’
শারমিন একাডেমির নির্মমতা : শারমিন একাডেমির ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, স্কুলের প্রিন্সিপাল শারমিন জাহান ও ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার বড়ুয়া শিশুটিকে দফায় দফায় মারধর করেন। শিশুটির মুখে স্ট্যাপলার ঢোকানোসহ অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এক আসামি কারাগারে গেলেও প্রধান অভিযুক্ত এখনও পলাতক।
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু বলেন, শারমিন একাডেমির ঘটনা কেবল একটি স্কুলের ব্যর্থতা নয়- এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। শিশুরা যদি স্কুলেই নিরাপদ না থাকে, তবে জাতির ভবিষ্যৎ কোথায় দাঁড়াবে? শিশু নির্যাতন বন্ধ করতে নীতিমালা নয়- কার্যকর আইন, কঠোর নজরদারি এবং সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
গবেষণায় ভয়াবহ চিত্র : ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস (বিইউএইচএস)-এর গবেষণায় দেখা যায়, পরিবারে ৫৮ শতাংশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৫৬ শতাংশ এবং খেলার মাঠে ৬৫ শতাংশ শিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার।
এদিকে ‘দ্য গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ টু অ্যান্ড অল করপোরাল পানিশমেন্ট অব চিলড্রেন’-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে শারীরিক শাস্তি এখনও ব্যাপকভাবে চলমান। এ জন্য নীতিমালাকে আইনে রূপ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

