

আবু হেনা সাকিল, রাবি প্রতিনিধি: জুলাই সনদ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আর কেউ লাগামহীন ক্ষমতার তাণ্ডব চলাতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রিয়াজ।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সিনেট ভবনে আয়োজিত 'গণভোট ২০২৬ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার প্রচারণা' শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মতবিনিময় সভায় আলী রিয়াজ বলেন, ‘জুলাই সনদ শুধু একটি সংবিধান নয়; এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পূর্ণ রূপরেখা।’এই সনদের মাধ্যমে দেশে জবাবদিহিমূলক বিচার ব্যবস্থা এবং সবার জন্য সমান ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, 'বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে দেশের মানুষ ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি, যার জন্য সরাসরি দায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি দলীয় স্বার্থে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেছেন।'
আলী রিয়াজ আরও বলেন, '২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাব দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। সে সময় নির্বাচন কমিশনকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল, ‘দেশের মানুষ কেন ভোট দেবে? আমি যা বলব তাই করো’—এই মানসিকতার মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে।'
তিনি অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় কর্মীদের দিয়ে গঠন করা হতো। একইভাবে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)ও দলীয় প্রভাবমুক্ত ছিল না। ছাত্রলীগের কর্মীদের উদ্দেশে বলা হতো—‘তোমরা শুধু পরীক্ষায় বসো, চাকরির ব্যবস্থা আমরা করে দেবো’—যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা। এর ফলে দেশের সাধারণ মানুষ সব ক্ষেত্রে বঞ্চিত ও প্রতারিত হয়েছে। তবে এখন সময় এসেছে পুরোনো ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভেঙে ফেলার। এই ঐতিহাসিক সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে মৌলিক পরিবর্তনের জন্য সংবিধান সংস্কার অপরিহার্য। একই সঙ্গে সংস্কার প্রস্তাবগুলোর পক্ষে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতই ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবো।
তরুণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা হয়তো সব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানেন না, কিন্তু এই বিষয়গুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
এদিকে সভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব বলেন, ‘২৪-এর জুলাই বিপ্লবকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো এই গণভোট।’ তিনি বলেন, গণভোটের কোনো মার্কা নেই; এটি আমাদের সন্তানদের রক্তের মূল্য দেওয়ার মাধ্যম।
উপাচার্য আরও বলেন, ‘জুলাইয়ে আমরা আমাদের সন্তানদের রক্তাক্ত শরীর নিয়ে টানাটানি করেছি—এই তিক্ত স্মৃতি সারাজীবন বহন করবো। একই সঙ্গে তাদের কাছে দেওয়া অঙ্গীকারও বহন করবো। সেই অঙ্গীকারের একটি প্রতিচ্ছবি হলো এই গণভোট।’
দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি একদিকে আশাবাদী, অন্যদিকে শঙ্কিত বলেও জানান। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। যারা ভাবছে ক্ষমতায় গিয়ে আগের মতো রাষ্ট্র চালাবে, তারা ভুল করছে।
তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, ‘আমি লিখে দিতে পারি—আগের ন্যায় কেউ আর এই রাষ্ট্র চালাতে পারবে না। জুলাইয়ের পর প্রেক্ষাপট বদলে গেছে।’এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—নিজেদের বদলাবো নাকি ধাক্কা খেয়ে বদলাবো। তবে ধাক্কা খেয়ে পরিবর্তন হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। লাগামহীন ক্ষমতার তাণ্ডব বাংলাদেশে আর চলবে না।

