ঢাকা
logo
প্রকাশিত : September 14, 2026

মা ও বন্ধুর সহযোগিতায় লাশ দ্বিখণ্ডিত করে সুটকেস-বস্তায় ভরে খালে ফেলে দেয় প্রেমিক

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর: গাজীপুরের জয়দেবপুরে ডোবার পানিতে সুটকেস ও প্লাস্টিকের বস্তায় ভাসমান দ্বিখণ্ডিত ও অর্ধগলিত নারীর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক তথ্য। পাঁচ বছরের প্রেমের সম্পর্ক, বিয়ে নিয়ে বিরোধ ও জমে থাকা ক্ষোভের জেরে প্রেমিক মিশন ইসলামের হাতে খুন হন ডলি আক্তার (৩০)। হত্যার পর পরিচয় গোপন ও লাশ গুম করতে বটি দা ও ব্লেড দিয়ে কোমর থেকে লাশ দ্বিখণ্ডিত করে একাংশ সুটকেসে এবং অপরাংশ বস্তায় ভরে খালের পানিতে ফেলে দেয়া হয়।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), গাজীপুর জেলা। হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রেমিক মিশন ইসলাম (২২), তার মা বানু আক্তার (৪৩) ও সহযোগী মিজানুর রহমান মিল্টনকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার তিনজনই আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সোমবার গাজীপুর মহানগরের রাজদীঘির উত্তর পাড়ে পিবিআই গাজীপুর জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মোঃ রকিবুল আক্তার।

তিনি জানান, নিহত ডলি আক্তার ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থানার পাহাড়পাবিজান গ্রামের বাদশা মিয়ার মেয়ে। তিনি গাজীপুরের জয়দেবপুর থানাধীন বানিয়ারচালা মেম্বারবাড়ী এলাকায় ভাড়া বাসায় একা বসবাস করতেন। স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর তিনি বাঘের বাজার এলাকার রিপিট গার্মেন্টসে সুইং অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

গত ১১ সেপ্টেম্বর বিকেলে জয়দেবপুর থানাধীন ভবানীপুর এলাকার হামজা অ্যাপারেলস লিমিটেডের উত্তর পাশে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পশ্চিম পাশের খালের পানিতে একটি ব্রিফকেস ও প্লাস্টিকের বস্তা ভাসতে দেখা যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্রিফকেসের ভেতর ও বস্তায় রাখা এক নারীর খণ্ডিত ও অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে।

পরে অজ্ঞাত নারীর দ্বিখণ্ডিত লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে পিবিআই গাজীপুর জেলা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ছায়া তদন্ত শুরু করে। পিবিআইয়ের ক্রাইমসিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, গোয়েন্দা তথ্য ও বিশ্বস্ত স্থানীয় সোর্সের সমন্বয়ে শুরু হয় নিবিড় অনুসন্ধান। তদন্তের একপর্যায়ে শনাক্ত হয় নিহত নারীর পরিচয়। একই সঙ্গে উন্মোচিত হয় হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের ঘটনাও।

পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামিদের আদালতে দেয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, ডলি আক্তারের সঙ্গে মিশন ইসলামের প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একই গার্মেন্টসে চাকরির সুবাদে তাদের পরিচয় হয়। ডলি প্রায়ই মিশনের ভাড়া বাসায় যাতায়াত করতেন। গত ৮ সেপ্টেম্বর রাতে ডলি মিশনের ভাড়া বাসায় যান। সেখানে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও ডলি একসঙ্গে রাতের খাবার খান। পরে বানু আক্তার পাশের কক্ষে ঘুমাতে গেলে মিশন ও ডলি একই কক্ষে অবস্থান করেন।

পিবিআই জানায়, পূর্বের বিভিন্ন বিষয় ও বিয়ে সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে মিশনের মনে ক্ষোভ তৈরি হয়। একপর্যায়ে ডলিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় সে। আসামির জবানবন্দি অনুযায়ী, ওই রাতে ডলিকে ঘুমের ওষুধ ও অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়ানো হয়। তিনি ঘুমিয়ে পড়লে রাত আনুমানিক ২টার দিকে মিশন লুঙ্গি দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে এবং পরে বালিশ দিয়ে মুখ চেপে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর লাশটি চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখে।

পরদিন সকালে ঘর পরিষ্কার করার সময় বানু আক্তার চৌকির নিচে ডলির লাশ দেখতে পান। এরপর লাশ গুমের পরিকল্পনা করা হয়। মিশন একটি সুটকেস সংগ্রহ করে। কিন্তু পুরো লাশ সুটকেসে না ধরায় ব্লেড ও বটি দা দিয়ে কোমর থেকে লাশটি দ্বিখণ্ডিত করা হয়। লাশের একাংশ সুটকেসে এবং অপরাংশ পলিথিনে মুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় রাখা হয়। পরে মিশন তার বন্ধু মিজানুর রহমান মিল্টনকে বাসা পরিবর্তনের কথা বলে ডেকে আনে। মিল্টন এসে সুটকেস ও বস্তা অটোরিকশায় তুলে দিতে সহযোগিতা করে।

পরে মিশন, তার মা বানু আক্তার ও মিল্টন মিলে সুটকেস ও বস্তা নিয়ে প্রথমে রাজেন্দ্রপুর এবং সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে ভবানীপুর এলাকায় যায়। ভবানীপুর ব্রিজ এলাকা থেকে মিশন ও মিল্টন সুটকেস ও বস্তা খালের পানিতে ফেলে দেয়। এ সময় মিল্টনের হাতে রক্ত লাগলে সুটকেস ও বস্তার ভেতরে কী রয়েছে জানতে চায় সে। একপর্যায়ে মিশন তাকে জানায়, সেখানে তার প্রেমের সম্পর্ক থাকা ডলি আক্তারের লাশ রয়েছে। পরে তারা নিজ নিজ বাসায় ফিরে যায়।

নিহতের বড় ভাই সোহেল (৪৪) বাদী হয়ে ১২ সেপ্টেম্বর জয়দেবপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগে মামলা করেন। মামলাটি তদন্তে নিয়ে পিবিআই দ্রুত সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করে। ১২ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে গাজীপুর মহানগরের সদর মেট্রো থানাধীন বাহাদুরপুর তুলসীভিটা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে মিজানুর রহমান মিল্টনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পৃথক ভাড়া বাসা থেকে মিশন ইসলাম ও তার মা বানু আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আসামিদের দেয়া তথ্য ও দেখানো মতে, মিশনের ভাড়া বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বটি দা, লাশ প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত স্কচটেপের অবশিষ্টাংশ, নিহত ডলি আক্তারের জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যবহৃত বাটন মোবাইল ফোন ও এক জোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি সুটকেস কেনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পিবিআই।

পিবিআই গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার মোঃ রকিবুল আক্তার বলেন, লাশটি অজ্ঞাত ও অর্ধগলিত অবস্থায় থাকায় প্রথমে মৃতার পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন ছিল। কিন্তু পিবিআইয়ের ক্রাইমসিন বিশ্লেষণ, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও বিশ্বস্ত সোর্সের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে মৃতের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদেরও আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

তিনি বলেন, তদন্তে পাওয়া আলামত, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আসামিদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হয়েছে। অপরাধী যত কৌশলেই অপরাধ সংঘটিত করুক না কেন, পেশাদার তদন্তের মাধ্যমে তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব। পিবিআই গাজীপুর জেলা এ ঘটনায় তারই একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই গাজীপুরের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান জানায়, গ্রেপ্তার তিন আসামিই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কোনো ব্যক্তি জড়িত আছে কি না এবং উদ্ধার করা আলামত ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram