

নুরুল ইসলাম আসাদ, উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি: বরিশালের উজিরপুর উপজেলার দক্ষিণ সাতলা নিমাই খেয়াঘাট থেকে নয়াকান্দি কলেজ পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার, অর্থাৎ ২ হাজার ৪১০ মিটার সড়কের পিচ ঢালাই নির্মাণকাজ নিয়ম ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রকৌশল বিভাগ। তবে সড়কের নির্মাণকাজ নিয়ে কিছু পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি অনলাইন মাধ্যমে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সড়কের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে অপপ্রচার চালাচ্ছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের তদারকিতেই নির্ধারিত কারিগরি মান অনুসরণ করে কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে বলে তারা জানান।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, একসময় যোগাযোগের দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে থাকা দক্ষিণ সাতলা ও আশপাশের এলাকার মানুষের জন্য সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিচ ঢালাই হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল অনেকটাই সহজ হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী, রোগী ও সাধারণ যাত্রীদের উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতে সময় ও দুর্ভোগ কমেছে। সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা থাকায় নতুন পিচঢালা সড়কটি এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও বাড়িয়েছে।
তবে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং সন্ধ্যা নদীর শাখা কচা নদীঘেঁষা খালের পানির প্রবল স্রোতের কারণে ভবিষ্যতে সড়কের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ কারণে সড়কের পাশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়কটির সংস্কার ও পিচ ঢালাইয়ের কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাসমিয়া এন্টারপ্রাইজ। নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে মহিউদ্দিন আহমেদ তালুকদার জানান, কাজ শুরুর পর থেকে নির্ধারিত নকশা, পরিমাপ ও কারিগরি নির্দেশনা অনুসরণ করেই নির্মাণকাজ করা হয়েছে। তার অভিযোগ, একটি পক্ষ রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে তাদের সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। এমনকি উজিরপুরের অন্য কোনো স্থানের সড়কের দৃশ্য কিংবা পুরোনো/ভিন্ন এলাকার ভিডিও ধারণ করে সেটিকে এই সড়কের ভিডিও হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, এ ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হচ্ছে এবং একটি উন্নয়নমূলক কাজ অযথা বিতর্কিত হচ্ছে।
মহিউদ্দিন আহমেদ তালুকদার বলেন, “আমরা রাস্তা নির্মাণের কাজ শতভাগ নিয়ম অনুযায়ী করার চেষ্টা করেছি। রাজনৈতিকভাবে আমাদের সমাজে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য একটি পক্ষ মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। অন্যস্থানের একটি ভিডিও ধারণ করে সেটিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। উজিরপুরের এই সড়কের এমন কোনো ভিডিও নেই। যারা ভূয়া ভিডিও তৈরি ও অপপ্রচার চালাচ্ছে, তাদের বিষয়ে প্রশাসনের কাছে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।”
এদিকে উজিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী সুব্রত রায় বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য স্থানের ভিডিও ক্লিপ ব্যবহার করে এই সড়কের নির্মাণকাজ নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সাম্প্রতিক বৃষ্টির কারণে সড়কের কিছু অংশে সামান্য ক্ষতি হয়েছে। বিষয়টি নজরে রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত অংশে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে পুনরায় পিচ ঢালাই করা হবে। প্রকৌশলীর বক্তব্য অনুযায়ী, বৃষ্টির কারণে সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হওয়া আর পুরো সড়কের নির্মাণমান খারাপ হওয়া এক বিষয় নয়। তাই কোনো ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগ ও সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
সড়কটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও মিশ্র কোনো অভিযোগের পরিবর্তে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই বেশি পাওয়া গেছে বলে সরেজমিনে জানা যায়। স্থানীয় বাসিন্দা সোবাহান হাওলাদার বলেন, “আগে এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে আমাদের অনেক ভোগান্তি হতো। বর্ষার সময় কাদা-পানিতে হাঁটা এবং যানবাহনে চলাচল দুটোই কঠিন হয়ে যেত। এখন পিচঢালা রাস্তা হওয়ায় মানুষের চলাচল অনেক সহজ হয়েছে। রাস্তার কাজ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা কথা শুনছি, তবে আমাদের চোখে রাস্তা হওয়াটাই বড় সুবিধা। কর্তৃপক্ষ যেন রাস্তার পাশে পানি নিষ্কাশন ও ভাঙন ঠেকানোর ব্যবস্থা করে, সেটাই আমাদের দাবি।”
স্থানীয় বাসিন্দা নাসিমা বেগম বলেন, “এই রাস্তা দিয়ে শিক্ষার্থী, নারী, শিশু, বয়স্ক মানুষসহ অনেকেই চলাচল করেন। আগে বর্ষায় আমাদের অনেক কষ্ট হতো। এখন রাস্তা ভালো হওয়ায় কলেজে যাওয়া-আসা ও বাজারে যাতায়াত সহজ হয়েছে। তবে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে রাস্তার পাশে পানি জমে গেলে বা খালের স্রোতে মাটি সরে গেলে সমস্যা হতে পারে। তাই রাস্তার কাজ শেষ হওয়ার পরও নিয়মিত নজরদারি দরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে কী বলল, তার চেয়ে আমাদের এলাকার বাস্তব অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।”
অপর এক স্থানীয় বাসিন্দা কলেজ ছাত্র মেহেদী হাসান বলেন, “রাস্তা পিচঢালা হওয়ায় আমরা খুশি। আমরা এখন কোনো রকম ঝামেলা বা দুর্ভেোগ ছাড়াই কলেজে যেতে পারছি। তবে রাস্তাটির কাজ শেষ হওয়ার পর বেশ কিছুদিন বৃষ্টি হওয়ায় অল্প কিছু যায়গার পিচ নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, কিন্তু চলাচলের তেমন সমস্যা-ই না এটা। রাস্তার পাশে যে খাল ও পানি প্রবাহ রয়েছে, সেটি নিয়ে ভবিষ্যতে যেন কোনো সমস্যা না হয়, সেদিকে প্রকৌশলীদের নজর দেওয়া প্রয়োজন। কোথাও ত্রুটি থাকলে সেটি সংশ্লিষ্ট দপ্তর তদন্ত করে ঠিক করে দিবে এটাই আমাদের চাওয়া।
যেকোনো সরকারি বা উন্নয়নমূলক অবকাঠামো নির্মাণে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে যাচাই হওয়াই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। প্রয়োজনে প্রকৌশলী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করে নির্মাণের পরিমাপ, উপকরণের মান, কারিগরি নির্দেশনা এবং কাজের বাস্তব অবস্থা পরীক্ষা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টি ও নদী-খালের পানির স্রোত থেকে সড়ক রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের ভাষ্য, উন্নয়নকাজ নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে তথ্য-প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা উচিত, যাতে প্রকৃত সমস্যা থাকলে দ্রুত সমাধান করা যায়।
