

চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণি পাঠদান। অবশেষে নতুন ভবন নির্মাণের প্রত্যাশায় প্রায় ১০ মাস আগে পুরাতন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিকে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। এরপরই শুরু হয় শ্রেণিকক্ষের সংকট। শ্রেণিকক্ষ সংকটের ফলে বিদ্যালয়টির ১৮১ কোমলমতি শিক্ষার্থীকে শ্রেণিপাঠ নিতে হচ্ছে শহিদ মিনারের বেদি ও টিনের ছাপড়া কিংবা খোলা আকাশের নিচে।
ঘটনাটি ঘটেছে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলাধীন রমনা ইউনিয়নের জোড়গাছ এলাকায় অবস্থিত খরখরিয়া ২নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
জানা গেছে, উপজেলার খরখরিয়া ২নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৯৭৩ সালে জাতীয়করণ করা হয়। বর্তমানে স্কুলটিতে ১৮১ জন শিক্ষার্থীকে শ্রেণী পাঠদান করাচ্ছেন ১০ জন শিক্ষক।
বিদ্যালয়টিতে ১৯৯০ সালে ২ কক্ষ বিশিষ্ট একটি ছাদ ঢালাই ভবন নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পিইডিপি-২ প্রকল্পের অধীনে দুই কক্ষবিশিষ্ট আরো একটি ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে ভবনটির একটি কক্ষ অফিস হিসেবে এবং অন্যটি ৫ম শ্রেণির ক্লাসরুম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
পুরাতন ভবনটি জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০২৫ সালে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। একই সময়ে নতুন ৫ কক্ষের একটি ভবনের জন্য প্রস্তাবনা পাঠানো হয়। তবে বরাদ্দ না আসায় নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর তারিখে সেটি নিলামের মধ্যেমে ভেঙে ফেলা হয়েছে। পুরাতন ভবনটি অপসারণের ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও নুতন ভবনের বরাদ্দ না পাওয়ায় খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করতে হচ্ছেন স্কুলটির কোমলমতি শিক্ষার্থীদের।
বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ২০০৫ সালে পিইডিপি-২ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ভবনটির একটি কক্ষ অফিস হিসেবে এবং অন্যটি ৫ম শ্রেণির ক্লাসরুম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেণিকক্ষ না থাকায় টিনের তৈরি অস্থায়ী ছাপড়ায় গাদাগাদি করে বসে আছে শিক্ষার্থীরা। বাইরে প্রচন্ড রোদ থাকায় ছাপরার ভেতরও তৈরি হয়েছে অসহনীয় গরম। বৃষ্টি হলে সেখানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষ না থাকায় শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেয়া হচ্ছে শহিদ মিনারের বেদিতে।
এসময় ৪র্থ শ্রেণি র শিক্ষার্থী মারিয়া আক্তার ও জয়ন্তি রাণী জানায়, গতকাল তারা বসে থাকা অবস্থায় বাতাসে ছাপড়া ঘরের একটি টিন খুলে এসে তাদের উপরে পড়েছিল। অল্পের জন্য তাদের বড় রকমের কোন ক্ষতি হয়নি।
শ্রেণিকক্ষের সংকট নিয়ে অভিভাবকদের প্রশ্ন, নতুন ভবনের অর্থায়ন ও অনুমোদন নিশ্চিত না করেই কেন পুরোনো ভবনটি অপসারণ করা হলো? বিকল্প শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা না করেই ভবন ভেঙে ফেলায় শিশুদের দুর্ভোগের দায় কে নেবে?
অভিভাবক জহুরুল ইসলাম বলেন, শিশুরা রোদে ও গরমের মধ্যে বসে ক্লাস করছে। বৃষ্টি হলে আবার ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়। কর্মকর্তারা এসে পরিস্থিতি দেখে গেলেও এখনো স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি।
স্কুলটির সহকারী শিক্ষক আয়েশা আক্তার বলেন, শ্রেণিকক্ষের অভাবে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন। আবহাওয়া খারাপ হলে স্বাভাবিকভাবে পাঠদান করাও সম্ভব হয় না।
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো.নুর মোস্তফা বলেন, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় দুর্ঘটনা এড়াতে নিলামের মাধ্যমে ভেঙে ফেলা হয়েছে। নতুন ভবনের বরাদ্দ পেতে দেরি হওয়ায় দুটি ছাপড়া ঘরের ব্যবস্থা করে পাঠদান চালু রাখা হয়েছে। তবে সব শ্রেণির জন্য পর্যাপ্ত কক্ষ করা সম্ভব হয়নি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো.কামরুজ্জামান বলেন, নতুন ভবনের জন্য প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন না আসা পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে পাঠদান চালিয়ে নিতে দুটি ঘরের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আরও কক্ষ নির্মাণের জন্য ৩ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন, ভবন নির্মাণের জন্য পিইডিপি-৪ প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। শিগগিরই পিইডিপি-৫ প্রকল্প চালু হবে। তখন বিদ্যালয়টির নতুন ভবনের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বরাদ্দ পাওয়ার আশা করছি। আপাতত শিক্ষার্থীদের পাঠদানে যাতে সমস্যা না হয়, সে জন্য টিনশেড কক্ষ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
