

মোঃ মোকাররম হোসাইন, কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি: কিডনির হাট নামে পরিচিত জয়পুরহাটের কালাইয়ে কিডনি ক্রয়-বিক্রয় চক্রের মূলহোতা সেই আব্দুস সাত্তারকে (৫৪) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার দিবাগত রাতে বগুড়া সদরের পৌরপার্ক এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃত আব্দুস সাত্তার কিডনির হাট নামে পরিচিত উপজেলার বহুতি গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বার খলিফার ছেলে। তার বিরুদ্ধে কিডনি কেনাবেচাসহ কালাই থানায় পাঁচটি মামলা রয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে তাঁকে আদালতের মাধ্যমে জেল-হাজতে পাঠানো হয়েছে। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন কালাই থানার তদন্ত ওসি দিপেন্দ্র নাথ সিংহ।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আর্থিক সংকটে থাকা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ এলাকার মন্টু মিয়াকে কিডনি বিক্রির জন্য ১০ লাখ টাকার প্রলোভন দেখানো হয়। এরপর তাকে ঢাকায় নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কিডনি টান্সপ্ল্যান্ট করতে নেপালে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট তৈরি করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে মন্টু মিয়াকে অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এরপর তাকে নিয়ে নেপালের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার একটি কিডনি অপসারণের কয়েক দিন পর বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। দেশে ফেরার পর কিডনি বিক্রির চুক্তির বাকি ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা চান মন্টু মিয়া। কিন্তু দালাল ছাত্তারসহ অন্য দালালরা তাকে টাকা না দিয়ে বিভিন্নভাবে টালবাহানা করতে থাকে। কিডনি বিক্রির টাকা না পেয়ে হতদরিদ্র কিডনি বিক্রেতা মন্টু মিয়া গত ১৩ জুন জয়পুরহাট আমলি আদালতে বগুড়া সদর উপজেলার নিশিন্দারা গ্রামের সাব্বির আহমেদ, শিবগঞ্জ উপজেলার কিচক মল্লিকপাড়া গ্রামের সুমন আলী, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের আব্দুল মান্নান ও সাইদুর রহমান, লওনা গ্রামের আব্দুস ছাত্তার এবং নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার ছোট হোসেনপুর রাজাগঞ্জ এলাকার তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরীকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। আদালতের নির্দেশে ওই দিনই কালাই থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়। আসামিদের মধ্যে তারেক আজম ওরফে বাবলু চৌধুরী কিডনি ক্রয়-বিক্রয়ের মহাজন হিসেবে পরিচিত। তিনি ঢাকার রায়েরবাগ এলাকায় থেকে জয়পুরহাটে দালাল নিয়োগ দিয়ে দরিদ্র মানুষদের টাকার লোভ দেখিয়ে দেশে-বিদেশে কিডনি ক্রয়-বিক্রয় করে আসছেন।
কালাইয়ে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় কিডনি ক্রয়-বিক্রয় দালালচক্রের দৌরাত্বের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দরিদ্র, ঋণগ্রস্ত ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষকে টার্গেট করে কিডনি বিক্রির জন্য প্রলুব্ধ করে আসছে এই চক্র। মাঝে প্রশাসনিক কড়া নজরদারির কারণে কিডনি ক্রয়-বিক্রয় ধীরগতিতে চললেও গত এক বছর ধরে আবারও মাথা চাড়া দিয়েছে। সক্রিয় হয়ে ওঠেছে দালাল চক্র।
আগে থেকেই কিডনির হাট নামে পরিচিত এলাকাগুলোর মধ্যে উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের ভেরেন্ডি, উলিপুর, সাতার, কুসুমসাড়া, অনিহার, ভাউজাপাতার, শিবসমুদ্র, পাইকশ্বর ও ইন্দাহার, উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া-বাইগুনি, বহুতি, মোহাইল, থল, বাগইল, মাস্তর, জয়পুর বহুতি, নওয়ানা বহুতি, দুর্গাপুর, উত্তর তেলিহার, ভুষা, কাশিপুর, বিনইল ও পূর্বকৃষ্টপুর, আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের রাঘবপুর, বোড়াই, হারুঞ্জা, নওপাড়া ও বালাইট গ্রামের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এসেছে। নতুন করে এসব গ্রামের সাথে যোগ দিয়েছে কালাই পৌরসভার আঁওড়া, থুপসারা, সিতাহার ও দুরুঞ্জ-নয়াপাড়া মহল্লা এবং জিন্দারপুর ইউনিয়নের এলতা, ইমামপুর, বেগুনগ্রাম, করিমপুর ও হাজিপুর-ঘাটুরিয়া এবং পুনট ইউনিয়ের জালাইগাড়ী, পাঁচগ্রাম, জগডুম্বর ও শান্তিনগর। বলতে গেলে পুরো উপজেলায় কিডনি ক্রয়-বিক্রয় চলছে।
মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯-এর ৯ ধারায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই আইনের ১০(১) ধারায় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রয়-বিক্রয় কিংবা এ কাজে সহায়তার জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
কালাই থানার ওসি তদন্ত দীপেন্দ্র নাথ সিংহ বলেন, কিডনি-সংক্রান্ত প্রতারনা মামলাটি থানায় গ্রহণের পর এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়। প্রযুক্তির সহায়তায় বুধবার রাতে অভিযান চালিয়ে বগুড়া সদরের পৌরপার্ক এলাকার থেকে এজাহারভুক্ত আসামি আব্দুস সাত্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি আরো বলেন, তাকে আজ আদালতের মাধ্যমে জেল-হাজতে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
