

হুমায়ুন কবীর রিন্টু, নড়াইল প্রতিনিধি: নড়াইলে নারীদের শিক্ষা প্রসারে গড়ে ওঠে নড়াইল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটির অগ্রযাত্রা শুরু হয় ১৯৫০ সালে। দীর্ঘ সাত দশকের বেশি সময় ধরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি অনেক সুনামের সাথে পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছরই এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় সুনামের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে দেশের স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করে। তবে এ প্রতিষ্ঠানের এই ঐতিহ্য ও অর্জনে বেশ কয়েক বছর ধরে ভাটা পড়েছে। শিক্ষক সংকট, উপযুক্ত শেণিকক্ষ সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জরাজীর্ণ ভবনে পাঠদানসহ নানা সমস্যায় এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে ভাটা পড়েছে।
সচেতন মহলের অভিযোগ, চরম শিক্ষক স্বল্পতা, জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, কয়েকজন শিক্ষকের কোচিং বাণিজ্যের কারণে এ প্রতিষ্ঠানের অবস্থা দিন দিন নিম্নগামী হচ্ছে। পরিস্থিতি এমনই যে লেখাপড়ার মান যেমন নিম্নগামী, সেই সাথে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মধ্যে।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বছর গুলোতে বিদ্যালয়টির স্বাভাবিক শিক্ষা পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শিক্ষকদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রাইভেট ও কোচিং বাণিজ্যের কারণে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম একেবারে ভেঙ্গে পড়েছে। কয়েকজন শিক্ষক আছেন যারা শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেটে পড়ার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে চাপ সৃষ্টি করেন। কেউ যেতে রাজি না হলে তাকে মানসিক চাপ সৃষ্টি করেন।
একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, নির্ধারিত প্রাইভেটে অংশ না নিলে পরীক্ষায় কাংখিত নম্বর মেলে না। নানাভাবে হুমকি ধামকি দেয়া হয়। শ্রেণিকক্ষে বাকা দৃষ্টিতে দেখা হয়। তাই ক্লাসে পাঠদানের সময় কোণঠাসা হয়ে থাকার ভয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রাইভেট বা কোচিংয়ে যেতে হয়। স্যারদের সুনজরে থাকতে প্রতি মাসে ৪/৫ হাজার টাকা গুনতে হয়। অসচ্ছল পরিবারের জন্য এটা মারাত্মক বাড়তি চাপ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, পাঠ্যক্রম বিশাল হওয়ায় এবং শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় না পাওয়ার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের প্রয়োজনে অতিরিক্ত সহায়তার জন্য শিক্ষকদের শরণাপন্ন হন। এটিকে একতরফাভাবে ‘বাধ্য করা’ হিসেবে দেখা ঠিক নয় বলে তাদের দাবি।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বহু পুরনো অ্যাকাডেমিক ভবনটি দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। ভবনের বিভিন্ন অংশের ছাদ ও দেয়াল হতে পলেস্তরা খসে খসে পড়ছে। ভেতর থেকে জংধরা রড বেরিয়ে এসেছে। সুরক্ষার স্বার্থে ভবনটির তৃতীয়তলা ইতোমধ্যে ‘পরিত্যক্ত’ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের তীব্র সংকটের কারণে প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা থেকেই প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ক্লাস পরিচালনা করতে হচ্ছে। প্রতিনিয়ত কাঠামোগত দুর্ঘটনার চরম আতঙ্ক নিয়ে ক্লাস করছে শিক্ষার্থীরা। জরাজীর্ণ ভবনে ক্লাস চলায় অভিভাবকদের মাঝে রয়েছে চরম হাতাশা ও উদ্বেগ।
কোচিং বাণিজ্য ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করতেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সনাতন রায় ইতস্তত করতে থাকেন। বার বার এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে তিনি জানান, বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যথাযথ দ্বায়িত্ব পালন করেন।
তবে অবকাঠামো ও শিক্ষক সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, শ্রেণিকক্ষের সংকটের পাশাপাশি এবং তীব্র শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ সাধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেয়ার চেষ্টা করেন শিক্ষকবৃন্দ। নতুন ভবন নির্মাণ ও ঝুঁকি নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন বলে জানান।
বিদ্যালয়ের নানামুখি সমস্যা ও অভিযোগ নিয়ে বিদ্যমান সংকট পর্যবেক্ষণ ও সরেজমিনে পরিস্থিতি জানতে এ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম। পরিদর্শনের সময় তিনি শিক্ষক সংকট দূরীকরণ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
তবে বিদ্যালয় চত্বরে চলমান নতুন ভবন নির্মাণকাজ পরিদর্শনকালে তিনি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। নির্মাণকাজে মানসম্মত রড, ইট ও সিমেন্ট ব্যবহার না করার অভিযোগ এনে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও তদারকী কর্মকর্তাদের বিরূদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী দেন। সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম বলেন, একটি ঐতিহ্যবাহী নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণে কোনো ধরনের নিম্নমানের কাজ বরদাস্ত করা হবে না। নতুন ভবনের কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের টেকসই সমাধানের জন্য সকল ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে বলে তিনি জানান।
নড়াইলের সর্বস্তরের জনগণ ও অভিভাবক মহলের মতে, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সুনাম রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থানীয় শিক্ষকদের বাইরে বদলি করা জরুরী। কারণ তারা স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে চলেন। অন্য শিক্ষকদের জিম্মি করে তাদেরকেও অপথে পরিচালত করেন। যার জন্য দিনদিন এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে।
