

উজিরপুর (বরিশাল) প্রতিনিধি: বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জল্লা ইউনিয়নের উত্তর বাহেরঘাট জোড়া ব্রিজসংলগ্ন প্রধান সড়কে গুলিতে নিহত এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সিয়াম মোল্লার হত্যার বিচার এবং গুলিবিদ্ধ এসএসসি পরীক্ষার্থী রাকিব মোল্লার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সর্বস্তরের এলাকাবাসী।
বুধবার (৮ জুলাই) বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত এ কর্মসূচিতে শত শত নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থী, তরুণ ও প্রবীণ অংশ নেন। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া মানুষের চোখেমুখে ছিল ক্ষোভ, বেদনা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। তাদের একটাই দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ঘটনার সময় সিয়াম ও রাকিব দুজনই ছিলেন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী। নিহত সিয়াম এইচএসসি প্রথম বর্ষের পরীক্ষার্থী এবং আহত রাকিব এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। পরিবারের দাবি, ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিল বিকেলে পরীক্ষা শেষ করে তারা বাড়ির পাশের একটি চায়ের দোকানে বসে গল্প করছিলেন। ঠিক তখনই আশপাশে হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হলে কী ঘটেছে তা দেখতে তারা উত্তর বাহেরঘাট জোড়া ব্রিজ অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যান। এলাকাবাসীর ভাষ্যনুযায়ী, সেখানেই ছোড়া গুলিতে দুজনই আহত হন। ঐ দিনই হাসপাতালে নেওয়ার পথেই সিয়ামের মৃত্যু হয় এবং রাকিবকে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মানববন্ধনে নিহত সিয়ামের পিতা রিপন মোল্লা, আহত রাকিব মোল্লা, নাসরিন বেগম, মীম বেগম, শরীফ, খালেক মোল্লা, শাপলা বেগম ও লিখন মোল্লাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন। বক্তারা অভিযোগ করেন, ঘটনার দীর্ঘ সময় পার হলেও ভুক্তভোগী পরিবার এখনও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত। তাদের ভাষ্য, একটি পরিবার তাদের সন্তানকে চিরদিনের জন্য হারিয়েছে, আরেকটি পরিবার আহত সন্তানের চিকিৎসা ও মামলা মোকাবিলা করতে গিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত সিয়ামের বাবা রিপন মোল্লা বলেন, "আমার ছেলে কোনো অপরাধী ছিল না। সে শুধু পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরেছিল। কিছুক্ষণ পর তার রক্তাক্ত মরদেহ আমাকে দেখতে হয়েছে। একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে? আমি কারও প্রতি প্রতিশোধ চাই না, আমি শুধু সত্য উদঘাটন এবং আমার সন্তানের হত্যার বিচার চাই।" তিনি অভিযোগ করেন, সাদা পোশাক পরিহিত র্যাব সদস্যদের গুলিতে তার ছেলে নিহত এবং রাকিব আহত হন।
গুলিবিদ্ধ রাকিব মোল্লা বলেন, শারীরিক ক্ষতের পাশাপাশি মানসিক যন্ত্রণা এখনও তাকে তাড়া করে বেড়ায়। তার অভিযোগ, আহত হওয়ার পরও তাকে একটি বানোয়াট ও মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে, যার বিচারিক প্রক্রিয়া এখনও চলমান। তিনি বলেন, "আমি নিজেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছি। অথচ আজও আমাকে আদালতে ঘুরতে হচ্ছে। আমি চাই সত্য সামনে আসুক এবং আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করা হোক।"
মানববন্ধনে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দা ও নিজেদের মামলার সাক্ষী দাবি করা কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, ঘটনার সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। তাদের ভাষ্য, তদন্তের স্বার্থে তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিজেদের দেখা ও জানা তথ্য তুলে ধরেছেন। তারা আশা প্রকাশ করেন, তদন্তকারী সংস্থা সাক্ষীদের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত সম্পন্ন করবে। একই সঙ্গে তারা বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং নির্দোষ কাউকে হয়রানি না করাই ন্যায়বিচারের মূল শর্ত।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, একজন সহপাঠীর প্রাণ হারানোর স্মৃতি আজও তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। তারা বলেন, "বই-খাতা হাতে পরীক্ষা দিতে যাওয়া একজন শিক্ষার্থীর জীবন এভাবে থেমে যেতে পারে না। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদে স্কুল-কলেজে যেতে পারবে এবং সুস্থভাবে পরিবারের কাছে ফিরে আসবে।" তাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে নিরাপত্তা, মানবিকতা ও ন্যায়বিচারের দাবি।
মানববন্ধনে এসময় এলাকাবাসী প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তারা বলেন, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। একই সঙ্গে নিহত সিয়াম মোল্লার মৃত্যুর বিচার নিশ্চিত করা, আহত রাকিব মোল্লার বিরুদ্ধে চলমান মামলার বিষয়ে আইনসম্মত ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে বৃহত্তর শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
