

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর: অপরাধ সংঘটনের আগেই সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হচ্ছে পুরো গাজীপুর মহানগরকে। একই সঙ্গে মাদক, ছিনতাই, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ঝটিকা মিছিল, কিশোর গ্যাং ও আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি)।
মঙ্গলবার সকাল ১১টায় গাজীপুরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব ঘোষণা দেন জিএমপির পুলিশ কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার। তিনি জানান, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) মহানগরে ১ হাজার ৮৫৪টি মামলা হয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন অপরাধে ৩ হাজার ২১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মাদক-সংক্রান্ত ৮১২টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৯৮৮ জন কারবারি। এছাড়া মাদক সেবনের অভিযোগে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ আইনে আরও ৯০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার জানান, গত ছয় মাসে দায়ের হওয়া মামলার মধ্যে হত্যা ২০টি, ডাকাতি ৭টি, ছিনতাই ২৮টি, সিঁধেল চুরি ১৬টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ১৭৬টি, অস্ত্র ৬০টি এবং অন্যান্য অপরাধে ৭৩৫টি মামলা রয়েছে।
তিনি বলেন, এ সময়ে ১০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ২০ রাউন্ড গুলি, চারটি ম্যাগাজিন, বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র, ৫১ হাজার ৫৬০টি ইয়াবা, ৩৫৭ কেজি ৩৬৫ গ্রাম গাঁজা, ১ কেজি ৯৬৫ গ্রাম হেরোইন, ৫৩০ পিস প্যাথেডিন, ৪৬ লিটার দেশীয় মদ, ১৫১ লিটার বিদেশি মদ এবং ২৭৬ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের চেষ্টা করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
তিনি জানান, গত ৩ জুলাই সদর থানার নান্দুয়াইন এলাকায় এবং ২১ জুন বাসন থানার মোগরখাল এলাকায় ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটে। এছাড়া মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় মিছিল বা মিছিলের চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় সদর থানায় দুটি, বাসন, কোনাবাড়ী, গাছা ও টঙ্গী পশ্চিম থানায় পৃথক পাঁচটিসহ মোট সাতটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৯৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মিছিলে অংশগ্রহণ, সহযোগিতা ও অর্থায়নের অভিযোগে আরও শতাধিক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তিনি বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের প্রকাশ্য বা গোপন কার্যক্রম, প্রচার-প্রচারণা কিংবা অর্থায়ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অপরাধ। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
টঙ্গী পূর্ব থানার পাগাড় বিসিক এলাকায় ঝুট ব্যবসাকে কেন্দ্র করে শক্তি প্রদর্শনের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে জানিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, এ ঘটনায় এজাহারভুক্ত ও তদন্তে শনাক্তসহ মোট ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মোটরসাইকেলে মহড়ায় অংশ নেওয়া অন্যদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ভূমিকার বিষয়ে তিনি বলেন, টঙ্গীসহ মহানগরের বিভিন্ন বস্তিতে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মাজার বস্তি, কেরানীর টেক, ব্যাংকের মাঠ ও এরশাদ নগর বস্তিতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি শীর্ষ মাদক কারবারিদের সম্পদের অনুসন্ধান করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
ছিনতাই প্রতিরোধে চেকপোস্ট, টহল, ব্লক রেইড ও বিশেষ অভিযান পরিচালনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশ ছিনতাইকারী পূর্বেও একই ধরনের অপরাধে জড়িত ছিল। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইন, অস্ত্র আইন এবং দস্যুতা-সংক্রান্ত মামলায় বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
অপহরণ ও হানি ট্র্যাপ প্রতিরোধে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, দ্রুত উদ্ধার অভিযান ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এসব অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পুলিশ কমিশনার জানান, মহানগরে বেওয়ারিশ লাশ ফেলে যাওয়ার ঘটনাও কমে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৯৪টি, ২০২৪ সালে ৯৬টি এবং ২০২৫ সালে ৮১টি হত্যা মামলা হলেও চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে হত্যা মামলা হয়েছে ২০টি। এর মধ্যে মাত্র একটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ নজরদারির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, মহানগরের বিভিন্ন এলাকার কিশোর গ্যাং সদস্যদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ শেষে তাদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অভিযান চালানো হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মো. ইসরাইল হাওলাদার বলেন, অপরাধপ্রবণ এলাকাসহ পর্যায়ক্রমে পুরো গাজীপুর মহানগরকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করে অপরাধ সংঘটনের আগেই সতর্ক সংকেত পাওয়া যাবে। পাশাপাশি কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
তিনি বলেন, "আমাদের লক্ষ্য গাজীপুর মহানগরকে একটি নিরাপদ ও শান্তির নগরীতে পরিণত করা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। নাগরিকদের সহযোগিতা এবং গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।"প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. তাহেররুল হক চৌহান, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ) মো. বেলায়েত হোসেন, উপ-পুলিশ কমিশনারসহ গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
