

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী, দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া, লক্ষ্মীপুর, পান্ডারগাঁও, নরসিংপুর, দোয়ারাবাজার সদর, বোগলাবাজার, মান্নারগাঁও, বাংলাবাজার ও সুরমা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি মাটি খেকো চক্র নির্বিচারে মাটি কেটে বিক্রি করে আসছে। ফসলি জমি, রাস্তার পাশ, খাল-বিল ও জলাশয় সংলগ্ন এলাকা থেকে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ, কৃষি ও জনজীবন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের আলো ও গভীর রাত—দুই সময়েই ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে মাটি কাটা হচ্ছে। এতে জমির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সৃষ্টি হচ্ছে গভীর গর্ত, যা বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অনেক এলাকায় রাস্তার পাশ থেকে মাটি কেটে নেওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
এলাকাবাসী জানায়, অবৈধভাবে কাটা মাটি ট্রাক ও ট্রলারে করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। এই চক্রের সঙ্গে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকায় সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। যারা প্রতিবাদ করেছেন, তারা নানাভাবে হুমকি ও চাপের মুখে পড়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, একাধিকবার উপজেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিত ও মৌখিকভাবে অবহিত করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের এই দীর্ঘস্থায়ী নিরবতায় মাটি খেকো চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং আগের চেয়ে বেশি এলাকায় কার্যক্রম ছড়িয়ে দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষক বলেন, 'আমাদের ফসলি জমি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। একবার মাটি কেটে নিলে সেই জমিতে আর চাষ করা যায় না। আমরা অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনো ফল পাইনি।'
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অবৈধ মাটি কাটা বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ এবং ভূমি ব্যবহার ও মাটি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আইন-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আইন অনুযায়ী, পরিবেশের ক্ষতি করে মাটি বা প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এতে জরিমানা ছাড়াও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইনজ্ঞদের অভিমত, প্রশাসন চাইলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা, যন্ত্রপাতি জব্দ ও অবৈধ কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, অবৈধ মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে দোয়ারাবাজার উপজেলার প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জলাধার ও কৃষিজমি ধ্বংস হলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়া, বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এলাকাবাসীর জোর দাবি—অবিলম্বে মাটি খেকো চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে, জড়িত প্রভাবশালীদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং পরিবেশ ও কৃষি জমি রক্ষায় প্রশাসনকে দৃশ্যমান ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। অন্যথায় দোয়ারাবাজার উপজেলার পরিবেশ, কৃষি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন এক ভয়াবহ সংকটে পতিত হবে।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার অরূপ রতন সিংহ বলেছেন, মাটি কেটে ফসলী জমি বিনষ্ট করার বিষয়ে আমরা অবগত। এসব বন্ধে প্রশাসন সোচ্চার। ইতোমধ্যে কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে জরিমানাও করা হয়েছে।
