

কন্যাশিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে পরিবার ও কমিউনিটির সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কন্যাশিশু দিবস ২০২৬ সামনে রেখে নারী উন্নয়ন শক্তি এবং ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেট যৌথভাবে ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকার খিলগাঁও এলাকার সুবিধাবঞ্চিত ২০ জন মাকে নিয়ে ‘শিশুবিবাহ প্রতিরোধ ও কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষায় কমিউনিটি মায়েদের নেতৃত্ব শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। প্রশিক্ষণটি অনুষ্ঠিত হয় নারী উন্নয়ন শক্তির রামপুরাস্থ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। এতে ফোরাম ফর কালচার অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট এবং গ্লোবাল ওয়ার্ক ফর সার্ভিসেস সহযোগিতা প্রদান করে।
বাংলাদেশে শিশুবিবাহ এখনো কন্যাশিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ বিকাশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের ২০২৫ সালের একাধিক সূচকভিত্তিক জরিপ অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে এবং ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। একই জরিপে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশুবিবাহের কারণে কিশোরীদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়া, অল্প বয়সে গর্ভধারণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, পারিবারিক সহিংসতা, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিকাশের সুযোগ সীমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে পরিবার ও স্থানীয় কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন।
এই প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য ছিল কমিউনিটির মায়েদের শিশুবিবাহের কারণ ও ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধি এবং কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় তাঁদের নেতৃত্বের সক্ষমতা তৈরি করা। প্রশিক্ষণে শিশুবিবাহের ঝুঁকি শনাক্তকরণ, কন্যাশিশুর শিক্ষা অব্যাহত রাখা, শিশুর অধিকার, পরিবারে সচেতনতা সৃষ্টি, অভিভাবকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা ও ব্যবহারিক অনুশীলন করা হয়।
প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী মায়েরা তাঁদের পরিবার ও কমিউনিটিতে শিশুবিবাহ প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার করেন। তাঁরা বলেন, শিশুবিবাহ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, স্থানীয় নেতৃত্ব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং কমিউনিটির সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মরত সংগঠনগুলো পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের কাছে সরাসরি পৌঁছে প্রয়োজনীয় সেবা ও সরকারি সহায়তার সঙ্গে তাদের সংযুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নারী উন্নয়ন শক্তির নির্বাহী পরিচালক ড. আফরোজা পারভীন, ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেটের নির্বাহী চেয়ারপারসন নুসরাত সুলতানা আফরোজ, ফোরাম ফর কালচার অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী সদস্য জনাব আব্দুল মমিন এবং গ্লোবাল ওয়ার ফর সার্ভিসেসের কর্মকর্তা সেলিনা খাতুন। তাঁরা শিশুবিবাহের ঝুঁকি ও প্রতিরোধ কৌশল, কন্যাশিশুর অধিকার, শিক্ষা অব্যাহত রাখা, পরিবারকে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় নেতৃত্ব বিকাশের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন।
প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী মায়েরা শিশুবিবাহ প্রতিরোধে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও কমিউনিটি সংগঠনগুলোর আরও কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁরা স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত সচেতনতা কার্যক্রম, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা, কন্যাশিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখার সুযোগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
নারী উন্নয়ন শক্তি এবং ইয়াং উইমেন ফর ডেভেলপমেন্ট রাইটস অ্যান্ড ক্লাইমেট মনে করে, শিশুবিবাহ প্রতিরোধের কার্যকর উদ্যোগের কেন্দ্রে পরিবার ও কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। বিশেষ করে মায়েদের সচেতনতা, নেতৃত্ব ও স্থানীয় পর্যায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণকে কাজে লাগানো গেলে কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষা, শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
দুই সংগঠন ভবিষ্যতেও সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, নাগরিক সমাজ, স্থানীয় নেতৃত্ব, পরিবার ও কমিউনিটির সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে শিশুবিবাহ প্রতিরোধ, কন্যাশিশুর অধিকার সুরক্ষা এবং নারীর নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
