

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও ডিজিটাল করার লক্ষ্যে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প আট বছরেও শেষ করা সম্ভব হয়নি। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি পাঁচ বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজের ধীরগতির কারণে এবার দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রকল্প ব্যয়ও বেড়েছে ১৫৯ কোটি টাকা। ফলে প্রকল্পের মোট ব্যয় ৫৬১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৭২০ কোটি ৮৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
নির্ধারিত মেয়াদ ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছিল মাত্র ২৩ শতাংশ। সে কারণে ২০২২ সালে প্রথম দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়।
কিন্তু অতিরিক্ত সময় পেয়েও কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে পাঁচ বছরের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগবে প্রায় এক দশক।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘ডিজিটাল পদ্ধতিতে তিনটি জরিপের মাধ্যমে তিনটি সিটি করপোরেশন, তিনটি পৌরসভা এবং দুটি গ্রামীণ উপজেলায় ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি স্থাপন’ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (ডিএলআরএস) প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারি প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা নতুন নয়। তবে ভূমি খাতের প্রকল্পগুলোতে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। এতে শুধু আর্থিক ব্যয়ই বাড়ে না, জনগণও কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে দীর্ঘ সময় বঞ্চিত থাকে। জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান দীর্ঘসূত্রতাকে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের অন্যতম বড় অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ব্যয় বাড়ল ১৫৯ কোটি টাকা : সংশোধিত প্রস্তাবের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৫৬১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। পরে প্রথম সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে প্রায় ৬৮০ কোটি ৫০ লাখ টাকা করা হয়। এবার দ্বিতীয় সংশোধনীতে ব্যয় আরো বাড়িয়ে ৭২০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে মূল অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৫৯ কোটি টাকা বা ২৮.৩ শতাংশ। প্রথম সংশোধিত ব্যয়ের তুলনায়ও অতিরিক্ত প্রায় ৪০ কোটি টাকা যোগ হয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়নের একটি বড় অংশ আসছে দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) ঋণ থেকে। বাকি অর্থের জোগান দেওয়া হচ্ছে সরকারি তহবিল থেকে। ফলে ব্যয় বৃদ্ধির চাপ শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই পড়ছে।
আরো আড়াই বছর বাড়ল মেয়াদ : ২০১৮ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এর পরও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।
ফলে মূল পরিকল্পনার তুলনায় প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় পাঁচ বছর অতিরিক্ত সময় লাগবে। আর প্রথম সংশোধিত মেয়াদের তুলনায় বাড়ছে আরো আড়াই বছর। সব মিলিয়ে প্রকল্পটি শেষ হতে সময় লাগবে প্রায় ১০ বছর।
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মাঠ পর্যায়ে জরিপ, তথ্য যাচাই, ডিজিটাল ম্যাপ প্রস্তুত, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হচ্ছে। এ কারণেই মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিন সিটি, তিন পৌরসভা ও দুই উপজেলায় ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থা : প্রকল্পের আওতায় তিনটি সিটি করপোরেশন, তিনটি পৌরসভা এবং দুটি গ্রামীণ উপজেলায় ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা হবে। ডিজিটাল সার্ভে, ম্যাপিং ও জিও-রেফারেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন ভূমি রেকর্ড প্রস্তুত করা হবে।
একই সঙ্গে মালিকানা তথ্য, খতিয়ান, মৌজা মানচিত্রসহ বিভিন্ন ভূমিসংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা হবে। এর মাধ্যমে ভূমির মালিকানা যাচাই, তথ্য সংরক্ষণ এবং ভূমি সেবা প্রদান আরো দ্রুত ও স্বচ্ছ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাড়বে রাজস্ব আদায়ের সুযোগ : প্রকল্পের লক্ষ্যপত্রে বলা হয়েছে, ভূমি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত হলে ভূমি প্রশাসনের দক্ষতা বাড়বে এবং সেবার মান উন্নত হবে। একই সঙ্গে ভূমি খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সুযোগও তৈরি হবে। ডিজিটাল রেকর্ড থাকলে জমি ক্রয়-বিক্রয়, নামজারি, উত্তরাধিকার এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই সহজ হবে। এতে সেবাগ্রহীতাদের সময় ও খরচ কমবে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতাও বাড়বে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো উদ্বেগের বিষয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে একদিকে সরকারি অর্থের ওপর চাপ বাড়ে, অন্যদিকে জনগণকে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
