

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশের বৈদেশিক ঋণের প্রবৃদ্ধিতে ছন্দপতন দেখা দিয়েছে। গত মার্চ শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি নেমে এসেছে ১১০ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ঋণের পরিমাণ কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই ঋণের স্থিতি কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ঋণ অনুমোদন ও প্রকল্প সহায়তার অর্থ ছাড় কমে যাওয়ার পাশাপাশি পুরনো ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়িয়ে বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা কমানো গেলে তা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হবে। তবে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের ঘাটতির কারণে ঋণ কমে থাকলে তা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় দেশে ডলারের সংকট বিরাজ করছে। এ সংকট মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও বিদেশি ঋণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ফলে ২০২৫ সালে ঋণ পরিশোধের চাপ থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছিল। সে সময় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা ও এআইআইবিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে ঋণ পেয়েছিল। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারাও তুলনামূলক কম সুদের বিদেশি ঋণ গ্রহণে আগ্রহ দেখান।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার কারণে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ঋণ প্রবাহের গতি কমে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায়, এখন সুদের পাশাপাশি মূল ঋণও পরিশোধ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে নির্বাচনপূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নতুন প্রকল্পে ঋণ অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের গতি মন্থর হয়ে পড়ে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১০ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার। তিন মাস আগে, অর্থাৎ গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার। ফলে এক প্রান্তিকে ঋণ কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। তবে আগের প্রান্তিকে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছিল প্রায় ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার।
সরকারি খাতে ঋণ কমার হার সবচেয়ে বেশি। মার্চ শেষে সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৯০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার, যা তিন মাস আগে ছিল ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ খাতে ঋণ কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ ২০ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০ দশমিক ০১ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
এদিকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও দ্রুত বাড়ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক
১১ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফরেক্স মার্কেট অ্যান্ড রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট রিপোর্ট ফর ফিসক্যাল ইয়ার ২০২৪-২৫’-এ বলা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শুধু আমদানি ব্যয় ও জ্বালানি বিল পরিশোধেই নয়, এখন সরকারি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। ফলে রিজার্ভের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
