

মো: মোকাররম হোসাইন, কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি: শ্রাবণ পেরিয়ে ভাদ্রের শুরু। বর্ষাকালের এ সময়ে যেখানে বৃষ্টির পানিতে সজীব থাকার কথা আমন খেত, সেখানে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার অনেক মাঠ এখন খাঁ খাঁ করছে। বৃষ্টির দেখা নেই দীর্ঘদিন। শুকিয়ে শক্ত হয়ে যাওয়া জমিতে দেখা দিয়েছে ফাটল। রোপণ করা আমনের চারা বাঁচাতে কৃষকদের ছুটতে হচ্ছে সেচের পানির পেছনে। কিন্তু, চুরির আশঙ্কায় অনেক গভীর নলকূপের মালিক ট্রান্সফরমার খুলে নামিয়ে রেখেছেন। ফলে অনাবৃষ্টির এ সময়ে জমিতে সেচের প্রয়োজন হলেও অনেক নলকূপ চালু করা যাচ্ছে না। ট্রান্সফরমার নামানো ও পুনরায় স্থাপন করতে বাড়তি অর্থ ব্যয় হয়। ফলে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় হঠাৎ বৃষ্টি নামার সম্ভাবনা কিংবা ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বারবার ট্রান্সফরমার ওঠানো-নামানোর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না নলকূপ মালিকরা।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অনেক আমনক্ষেতে মাটির উপরিভাগ শুকিয়ে ফেটে গেছে। কোথাও কোথাও পানির অভাবে চারা শুকিয়ে নুয়ে পড়েছে এবং হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। কেউ কেউ জমির আর্দ্রতা ধরে রাখতে কৃষকদের অতিরিক্ত সেচ দিচ্ছে। অথচ আমন মৌসুমে বৃষ্টিনির্ভর চাষাবাদের ওপরই সাধারণত নির্ভর করেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। তাই বৃষ্টির পানির জন্য অপেক্ষা করছে অনেকে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কালাই উপজেলায় আমন ধান মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৮৮৫ হেক্টর। এসব জমিতে সেচ দিতে উপজেলায় রয়েছে ৪৯৬ টি গভীর ও ২৮৭ টি অগভীর নলকূপ। ফলে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বেড়ে যায়।
কৃষকদের অভিযোগ, ট্রান্সফরমার স্থাপন করলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে না। বারবার লোডশেডিং হলে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অন্যদিকে ট্রান্সফরমার উঠানো-নামানোর খরচও কম নয়। বৃষ্টি না হলে একদিকে সেচ দিতে হচ্ছে, আবার হঠাৎ বৃষ্টি হলে ট্রান্সফরমার খুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও বিপাকে পড়তে হচ্ছে। এতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির মুখে পড়ছেন কৃষক ও নলকূপ মালিক উভয়েই।
কালাই উপজেলার হাতিয়র গ্রামের কৃষক তাজমহল বলেন, বৃষ্টি না থাকায় সেচ দিয়ে ধান বাঁচাতে হচ্ছে। কিন্তু যখন সেচ দেওয়ার সময় বিদ্যুৎ থাকে না, তখন অনেক সমস্যায় পড়তে হয়। শেষ পর্যায়ে এসেও ধানের বাজার খুবই কম। আমন ধানে কয়েক দফা সেচ দিতে হলে এবার আমনে লাভ করা কঠিন হয়ে যাবে।
এ উপজেলার আরেক কৃষক রাশিদুল আলম বলেন, আমন ধান বর্ষার পানির ওপর নির্ভর করেই চাষ করি। ভাদ্র মাসে ধানের গোছা বাড়ানোর সময়। অথচ সে সময়ে পানি না থাকায় জমেছে ফেটে চৌচির। কিন্তু এবার যদি সেচ দিতে হয়, তাহলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। ধানের দাম যদি সেই অনুপাতে না বাড়ে, শেষ পর্যন্ত কৃষকই লোকসানে পড়বে। তাই বৃষ্টি অপেক্ষা করছি।
গভীর নলকূপের মালিক সামসুল হোসেন বলেন, চুরির ভয়ে ট্রান্সফরমার নামিয়ে রেখেছি। এখন বৃষ্টি না থাকায় সেচের প্রয়োজন হলেও বারবার ওঠানো-নামানোর খরচ বহন করা কঠিন। তার ওপর লোডশেডিং সব মিলিয়ে ট্রান্সফরমার তুলেও লোকসানের আশঙ্কা আছে।
কালাই উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ বলেন, আমনের শুরুর দিকে জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন বৃষ্টির ঘাটতি থাকলে চারা দুর্বল হয়ে ফলনেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়ার পাশাপাশি জমিতে পানির অপচয় রোধ ও মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখার বিষয়ে কৃষকদের সচেতন হতে হবে।
