

দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রবাহ ২০২৫ সালে সার্বিকভাবে বাড়লেও নতুন মূলধনী বিনিয়োগে সুখবর নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছর নিট এফডিআই প্রবাহ এসেছে ১৭৭ কোটি ডলার। এটি আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৫০ কোটি ডলার বা ৩৯ শতাংশ বেশি। তবে এর বিপরীতে নতুন মূলধনী বিনিয়োগ বেড়েছে মাত্র ১ কোটি ডলার বা ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এ সময়ে আন্তঃপ্রতিষ্ঠানের ঋণ আকারে বিনিয়োগ বেড়েছে রেকর্ড ৩৩ কোটি ডলার বা ৩১৮ শতাংশ। আর পুনর্বিনিয়োগ বেড়েছে ১৬ কোটি ডলার বা ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ সার্বিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা মূলত ঋণনির্ভর ও পুনর্বিনিয়োগ।
মূলত বিদেশিরা নতুন মূলধন নিয়ে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের চেয়ে বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বা সম্প্রসারণে নিজেদের মধ্যে ঋণ লেনদেন ও পুনর্বিনিয়োগ বাড়িয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিনিয়োগের গুণগত দিক থেকে ইতিবাচক সংকেত নয়। কারণ প্রকৃত নতুন বিনিয়োগই দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের উচ্চ প্রবৃদ্ধি কিছুটা ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। কারণ, এটি ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি করতে পারে এবং বৈদেশিক লেনদেনে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করতে পারে। এ অবস্থায় বিদেশি বিনিয়োগে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে মূলধনী বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তারা।
নতুন মূলধনী বিনিয়োগে স্থবিরতার পেছনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদপূর্ব রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যা, উচ্চ সুদ এবং ডলার সংকটকে দায়ী করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, এই ৫টি কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে ধীরগতি ছিল। আর দেশি বিনিয়োগ কমার কারণে বিদেশিরা নতুন বিনিয়োগে আস্থা সংকটে ছিলেন। কারণ দেশি উদ্যোক্তাদের মতো তারাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এ ছাড়া ব্যবসা সহজীকরণে পিছিয়ে থাকা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রতা বিদেশি বিনিয়োগে বাধা হিসেবে কাজ করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ২০২৫ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতা নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতার বড় কারণ। দেশে নির্বাচিত সরকার না থাকায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নীতি-পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তায় দেশি উদ্যোক্তাদের মতো বিদেশিরাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ছিল। এখন নির্বাচিত সরকার বিনিয়োগ পরিবেশের দিকে নজর দিলে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে।
একই অভিমত দেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ আনতে অন্তর্বর্তী সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে এসব উদ্যোগ বাধার মুখে পড়ে। সে সময় দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ছিল বিনিয়োগকারীরা। কারণ তারা জানত অন্তর্বর্তী সরকার স্থায়ী হবে না। নির্বাচন নিয়েও তখন কোনো পরিষ্কার রোডম্যাপ ছিল না। নানা ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল, সামনের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে কিনা, তা নিয়েও সন্দেহ ছিল। এসব কারণে বিনিয়োগ কমেছে।
সাধারণত তিন পদ্ধতিতে বিদেশিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারে। এগুলো হলো- নতুন পুঁজি তথা মূলধনী বিনিয়োগ, বিদ্যমান ব্যবসা থেকে অর্জিত আয়ের পুনর্বিনিয়োগ এবং আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ (ইন্ট্রা-কোম্পানি লোন)। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলছে, ২০২৫ সালে বিদেশিরা মূলধন (ইক্যুইটি) হিসেবে মোট ৭৩ কোটি ১২ লাখ ডলারের বিনিয়োগ করে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৮৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার। এই হিসাবে গত বছর মোট মূলধনী বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৮ কোটি ২৯ লাখ ডলার। মোট মূলধনী বিনিয়োগ থেকে গত বছর মুনাফা প্রত্যাবাসন বাবদ বিদেশিরা নিজ দেশে প্রেরণ করে ১৭ কোটি ৬৬ লাখ ডলার।
ফলে নিট মূলধনী বিনিয়োগ দাঁড়ায় ৫৫ কোটি ৪৬ লাখ ডলার, যা আগের বছর ছিল ৫৪ কোটি ৪৬ লাখ ডলার। অর্থাৎ গত বছর নতুন মূলধনী বিনিয়োগ বেড়েছে মাত্র ১ কোটি ডলার বা ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৪ সালে মোট মূলধনী বিনিয়োগ বেশি আসার বিপরীতে মুনাফা প্রত্যাবাসনও বেশি ছিল। ওই বছর মুনাফা প্রত্যাবাসনের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৭ কোটি ডলার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিদেশিরা মোট পুনর্বিনিয়োগ করেছিল ২৫৬ কোটি ২৩ লাখ ডলার। এই পুনর্বিনিয়োগের বিপরীতে নিজ দেশে মুনাফা প্রত্যাবাসন করেন ১৭৮ কোটি ডলার। ফলে গত বছর নিট পুনর্বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৮ কোটি ১৬ লাখ ডলার। ২০২৪ সালে নিট পুনর্বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬২ কোটি ১৯ লাখ ডলার। ফলে গত বছর বিদেশিদের পুনর্বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১৫ কোটি ৯৭ লাখ ডলার। অন্যদিকে ২০২৫ সালে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ হিসেবে বিদেশিরা মোট বিনিয়োগ করে ১৪০ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা ২০২৪ সালে ছিল ১০০ কোটি ৪১ লাখ ডলার। এই আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের বিনিয়োগ থেকে মুনাফা প্রত্যাবাসন করে ৯৬ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। ফলে নিট আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের বিনিয়োগ দাঁড়ায় ৪৩ কোটি ৪১ লাখ ডলার, যা ২০২৪ সালে ছিল মাত্র ১০ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। এই হিসাবে গত বছর নিট আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণের বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৩৩ কোটি ডলার বা ৩১৮ দশমিক ২১ শতাংশ।
সব মিলে ২০২৫ সালে দেশে নিট এফডিআই প্রবাহ বেড়ে দাঁড়ায় ১৭৭ কোটি ডলার। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় ৫০ কোটি ডলার বা ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। তার আগের বছর ২০২৩ সালে দেশে নিট এফডিআই আসে ১৪৬ কোটি ৪১ লাখ ডলার। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ৬ বছরের মধ্যে ২০২১ সালে দেশে সর্বোচ্চ ১৫৭ কোটি ডলারের নিট এফডিআই আসে। এর পর থেকে টানা তিন বছর নিম্নমুখী ধারায় ছিল এফডিআই। তবে গত বছর কিছুটা উন্নতি হয়েছে নিট এফডিআই প্রবাহে।
প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি ৪৪ কোটি ৮১ লাখ ডলারের নিট বিনিয়োগ এসেছে বিদ্যুৎ খাতে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা খাদ্যপণ্য খাতে এসেছে ৪১ কোটি ডলার। এ ছাড়া বস্ত্র খাতে আসে তৃতীয় সর্বোচ্চ ১৮ কোটি ৯২ লাখ ডলার। অন্যদিকে গত বছর বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ৫৪ কোটি ৪৬ লাখ ডলারের নিট বিনিয়োগ করে নেদারল্যান্ডস। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩২ কোটি ১১ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে চীন। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর ১৯ কোটি ২৪ লাখ ডলার বিনিয়োগ করে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

