ঢাকা
logo
প্রকাশিত : April 7, 2026

তামাক নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে: গবেষণা

বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইন প্রয়োগে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে বলে উঠে এসেছে একাধিক গবেষণায়। সোমবার (৬ এপ্রিল) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক গবেষণা সম্মেলনে এসব ফলাফল তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রাম (বিসিসিপি) এবং বাংলাদেশ টোব্যাকো কন্ট্রোল রিসার্চ নেটওয়ার্ক (বিটিসিআরএন) যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল টোব্যাকো কন্ট্রোল (আইজিটিসি)-এর সহযোগিতায় এ রিসার্চ ফাইন্ডিংস ডিসেমিনেশন সম্মেলনটি আয়োজন করে।

সম্মেলনে ২০২৫ সালের প্রোগ্রামের আওতায় পরিচালিত সাতটি গবেষণার ফলাফল এবং নির্বাচিত দেশীয় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। এই গবেষণাগুলোর ফলাফলে দেখা যায়, তামাকমুক্ত পরিবেশের প্রতি জনগণের উচ্চ সচেতনতা ও শক্তিশালী সমর্থন থাকা সত্ত্বেও বিদ্যমান তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বাস্তবায়নে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রেলস্টেশন ও ট্রেনসহ বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে ধূমপানমুক্ত আইন লঙ্ঘন ব্যাপকভাবে চলছে, যার পেছনে রয়েছে আইনের দুর্বল প্রয়োগ, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্তৃত্বের অস্পষ্টতা এবং বর্তমান আইন এর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, যেমন দুর্বল নজরদারি (মনিটরিং) ব্যবস্থা। একই সময়ে, আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তামাকের উপস্থাপনায় প্রায়ই যথাযথ স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা অনুপস্থিত থাকে, যা উদীয়মান গণমাধ্যমের জন্য কার্যকর ও প্রয়োগযোগ্য মানদণ্ডের অভাবকে নির্দেশ করে এবং বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তামাক ব্যবহার স্বাভাবিক একটি বিষয়ে পরিণত করতে ভূমিকা রাখছে। এই দুর্বল নিয়ন্ত্রণের ধারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও পরিলক্ষিত হয়, বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও একক শলাকা বিক্রয়সহ বিক্রয়কেন্দ্রের নৈকট্য এবং প্রচারণামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে, যা তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি করে এবং শিক্ষার্থীদের ধূমপানের আচরণে প্রভাব ফেলে।

এছাড়াও, ধোঁয়াবিহীন তামাক খাতটি এখনও ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে, যেখানে অনানুষ্ঠানিক উৎপাদন, দুর্বল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে বিচ্ছিন্ন তদারকি বিদ্যমান, পাশাপাশি খুচরা পর্যায়ের বাইরে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব রয়েছে। এই কাঠামোগত ঘাটতিগুলো আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় ই-সিগারেট ব্যবহারের বৃদ্ধি থেকে, যা বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে সহজলভ্য এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এর বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ তরুণ ব্যবহারকারী, ই-সিগারেট ব্যবহারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে একটি প্রধান প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করে; পাশাপাশি বিপণন কৌশল, সহপাঠীর প্রভাব এবং ভ্যাপিংকে আধুনিক ও তুলনামূলক কম ক্ষতিকর হিসেবে দেখার প্রবণতা তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহার বাড়িয়ে তুলছে।

সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের (বিশ্বস্বাস্থ্য অনুবিভাগ) অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি। তিনি বলেন, সরকার শক্তিশালী নীতিমালার মাধ্যমে বাণিজ্যিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সম্প্রতি প্রণীত ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫-এ যুগান্তকারী সংস্কার আনা হয়েছে। এতে ই-সিগারেট, ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ইএনডিএস) এবং হিটেড টোব্যাকো পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, যা উদীয়মান হুমকি মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষার প্রতি সরকারের দৃঢ় প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।

তিনি আরও বলেন, অধ্যাদেশ অনুযায়ী, স্কুল, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলার মাঠ ও পার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত পণ্য বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা তরুণদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি তামাকজাত পণ্যের মোড়কের ৭৫ শতাংশ অংশে গ্রাফিক স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা পূর্বে ছিল ৫০ শতাংশ। এছাড়া, তামাক কোম্পানিগুলো আর ‘সিএসআর’ এর আড়ালে প্রচারণা চালাতে পারবে না। কোনো সিএসআর কার্যক্রম বা ইভেন্ট স্পন্সরশিপে কোম্পানির লোগো, নাম বা ট্রেডমার্ক ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল টোব্যাকো কন্ট্রোল (আইজিটিসি)-এর ডিরেক্টর জোয়ানা কোহেন বলেন, তামাকগ্রহণ সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য। ‘প্রথাগত’ বা ‘সাধারণ’ সিগারেট বলে কিছু হয় না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শক্তিশালী তামাক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। উচ্চ হারের কর আরোপ, বিজ্ঞাপন নিষেধাজ্ঞা, প্লেইন প্যাকেজিং এবং ধূমপানমুক্ত আইন প্রয়োগ করে ধূমপানের হার অনেকটাই কমানো যেতে পারে। এতে করে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন রক্ষা করা যাবে। কঠোর নীতিগত পদক্ষেপ না নিলে তামাক শিল্প আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে তরুণদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে তাদের বাজার টিকিয়ে রাখবে।

উদ্বোধনী অধিবেশনের সভাপতি গ্রিন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন বলেন, ধূমপান মানবস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। প্রাণঘাতী রোগ ও অকাল মৃত্যুর কারণ এটাই। তামাক সেবনের কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। ব্যক্তি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এটা অবশ্যই পরিহার করা জরুরি।

বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি রাজেশ নারওয়াল বলেন, মাত্র ৩০ মিনিটেই এই দেশে তামাকজনিত রোগে অন্তত ১০ জন মানুষের মৃত্যু হয়। জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপর্যয় এই অবস্থা প্রতিরোধযোগ্য। তাই তামাক সেবন নিয়ন্ত্রণে এবং মানুষের জীবন রক্ষায় জরুরি ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিটিসিআরএন-এর সভাপতি ড. নওজিয়া ইয়াসমিন। সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. সৈয়দ জাকির হোসেন এবং বিসিসিপির পরিচালক ও সিইও মোহাম্মদ শাহজাহান। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিআই পার্টনার ও অনুদানপ্রাপ্ত গবেষক, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকসহ প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর কমিউনিকেশন প্রোগ্রামস (বিসিসিপি) টোব্যাকো কন্ট্রোল পলিসি রিসার্চ গ্রান্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিগত ১৩ বছর ধরে বাংলাদেশের তামাক নিয়ন্ত্রণের অগ্রগতি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখছে এবং এই প্রোগ্রামের অর্জনসমূহ প্রতি বছর অনুষ্ঠিত রিসার্চ ফাইন্ডিংস ডিসেমিনেশন কনফারেন্সের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে তুলে ধরছে।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram