

সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে পরিবহনব্যবস্থায় ভারসাম্য আনা, পণ্য পরিবহন ব্যয় হ্রাস এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংযোগ শক্তিশালী করতে রেলকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত বহুমুখী পরিবহন রোডম্যাপ চূড়ান্ত করছে পরিকল্পনা কমিশন। এই পরিকল্পনায় রেলপথের আধুনিকায়ন, বিদ্যুতায়ন ও ডবল লাইন সম্প্রসারণের পাশাপাশি নৌপথের নাব্যতা বৃদ্ধি, নদীবন্দর আধুনিকীকরণ এবং জাতীয় মহাসড়ক উন্নয়নের মাধ্যমে রেল, নৌ ও সড়ক নেটওয়ার্ককে একীভূত করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো সড়কের ওপর চাপ কমানো, পণ্য পরিবহনে রেলের অংশীদারি ৫ শতাংশের কম থেকে বাড়িয়ে অন্তত ২০ শতাংশে উন্নীত করা এবং বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মধ্যে দ্রুত ও সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ কয়েক মাস ধরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে কাজ করছে।
ছয় মাসের পরামর্শ ও পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শেষে সুপারিশগুলোর সারসংক্ষেপ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং তা শিগগিরই সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপন করা হবে।
বর্তমানে দেশের মোট যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের প্রায় ৮০ শতাংশই সড়কপথের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে জাতীয় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, দ্রুত অবকাঠামো ক্ষয় হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। একই সঙ্গে নতুন সড়ক নির্মাণে অধিগ্রহণ জটিলতা ও ব্যয় বৃদ্ধির মতো সমস্যাও বাড়ছে।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই পরিবহন ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনতে রেল ও নৌপথের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত রোডম্যাপে রেল খাতকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কারণ স্বল্প ব্যয়ে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন হিসেবে রেলের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে দেশের মোট রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় তিন হাজার ৯৩ কিলোমিটার এবং ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৯টি জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-মাতারবাড়ী, চিলাহাটি-ঈশ্বরদী-খুলনা-মোংলা, ঢাকা-সিলেট-শাহবাজপুরসহ মোট ১০টি প্রধান করিডরে ট্রেন চলাচল করছে। তবে অবকাঠামোর বড় অংশ পুরনো হওয়ায় রেল পরিচালনায় নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট ২৯৪টি লোকোমোটিভ রয়েছে, যার মধ্যে ১৬২টি মিটার গেজ এবং ১৩২টি ব্রড গেজ। যাত্রীবাহী কোচ রয়েছে এক হাজার ৮৩৮টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক লোকোমোটিভ ও কোচ এরই মধ্যে অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল অতিক্রম করেছে।
প্রায় ৬৯ শতাংশ মিটার গেজ এবং ২৭ শতাংশ ব্রড গেজ লোকোমোটিভ পুরনো হয়ে যাওয়ায় ট্রেন পরিচালনায় বিলম্ব ও সময়ানুবর্তিতার সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় নতুন লোকোমোটিভ, কোচ ও ওয়াগন সংগ্রহের পাশাপাশি রেলপথ আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে প্রধান করিডরগুলোতে ডুয়াল গেজ ডবল লাইন নির্মাণ, পুরনো রেললাইন ও সেতু সংস্কার এবং আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
রেলের বিদ্যুতায়নও এই রোডম্যাপের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বিদ্যুত্চালিত ট্রেন চালু করা হবে। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা ও ঢাকা-জয়দেবপুর রুটেও বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে আন্ত নগর ও কমিউটার সেবা আরো দ্রুত ও আধুনিক করা যায়। রেলের পাশাপাশি নৌপরিবহন খাতেও বড় ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নদীবেষ্টিত দেশ হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে দেশের নৌপথের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বর্ষাকালে দেশের নৌপথের দৈর্ঘ্য প্রায় সাত হাজার ৮০০ কিলোমিটার হলেও শুষ্ক মৌসুমে তা কমে প্রায় ছয় হাজার ১০০ কিলোমিটারে নেমে আসে। নাব্যতা সংকট মোকাবেলায় কৌশলগত ড্রেজিং, নদীশাসন এবং নদীতীর সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে নাব্য নৌপথের দৈর্ঘ্য ১০ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পণ্য পরিবহন জোরদার করতে তিনটি বড় অভ্যন্তরীণ নৌকেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এর একটি আশুগঞ্জ নদীবন্দরকে ঘিরে, যা হবিগঞ্জ ও নরসিংদীর সম্প্রসারিত শিল্পাঞ্চলকে সেবা দেবে। দ্বিতীয় কেন্দ্র হবে পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালকে কেন্দ্র করে, যাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানজট কমানো যায়। তৃতীয় কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে যশোরের নওয়াপাড়া নদীবন্দর এলাকায়। এ ছাড়া পানগাঁও, আশুগঞ্জ, নগরবাড়ী, চাঁদপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরগুলোতে কাস্টমস ও অন্যান্য সেবা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। নদীবন্দরগুলোর সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সমুদ্রবন্দর উন্নয়নও এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং বে টার্মিনাল প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মোংলা ও পায়রা বন্দরকে পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সড়ক খাতেও বেশ কিছু সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে তিন হাজার ৯৯০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, চার হাজার ৮৯৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ১৩ হাজার ৫৮৮ কিলোমিটার জেলা সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে ৮৫১ কিলোমিটার চার লেন মহাসড়ক, ১৩৮ কিলোমিটার সার্ভিস লেনসহ ছয় লেন মহাসড়ক রয়েছে। পরিকল্পনায় জাতীয় মহাসড়কের মানোন্নয়ন, নতুন এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, সার্ভিস লেন সম্প্রসারণ এবং এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ জোরদারের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান কবির আহমেদ বলেন, সড়ক, রেল ও নৌ—এই তিন খাতের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবহনকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিটি মন্ত্রণালয় একই লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করতে পারবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, বর্তমানে পণ্য পরিবহনে রেলের অংশীদারি ৫ শতাংশেরও কম। তবে নতুন লোকোমোটিভ, কোচ ও ওয়াগন সংগ্রহ এবং কনটেইনার ট্রেন পরিচালনা বাড়ানোর মাধ্যমে এই অংশীদারি ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে এটি অন্তত ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এই উদ্যোগ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইশতেহারে ডবল লাইন ও উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক, জাতীয় এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড, স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আধুনিক নৌপথ এবং বন্দর উন্নয়নের কথা উল্লেখ রয়েছে।

