

প্রতিবারই ঈদ আসত, বিএনপির নেতাকর্মীরা জেলখানা কিংবা আত্মগোপনে থেকে ঈদের চাঁদ দেখতেন। পরিবারের সঙ্গে সেমাই খাওয়া বা সন্তানদের নতুন জামা কিনে দেওয়ার আনন্দ ছিল তাদের কাছে অলীক কল্পনা। তবে ২০২৬ সালের এই ঈদুল ফিতর বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য নতুন অধ্যায় হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। দীর্ঘ ১৬ বছরের রাজনৈতিক নির্বাসন, গুম-নির্যাতনের স্মৃতি ও শাসকের দমনপ্রবণতার মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীদের যে দিনগুলো কেটেছে, সেই দিনের পর এবার স্বাধীন দেশে নিজের এলাকায় শান্তিপূর্ণভাবে ঈদ উদযাপনের স্বস্তি তাদের হাতে এসেছে।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ভূমিধস’ বিজয়ের পর ঈদ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের সফল সমাপ্তি এবং জনগণের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সংযোগের মহোৎসব হতে পারে। দলের নেতাকর্মীরা পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবেন, তৃণমূলের আস্থা অর্জন এবং দীর্ঘদিনের ক্ষত ও স্মৃতিকেও নতুন সূচনার প্রতিশ্রুতি হিসেবে মনে করছেন।
দলটির নেতাকর্মীরা জানান, এবার দলের প্রত্যেক নেতাকর্মী মুক্ত বাতাসে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে নানামুখী পরিকল্পনা করছেন। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারাও ছুটছেন তৃণমূলের আস্থা অর্জন করতে। তারা বিগত দিনে নির্যাতিত নেতাকর্মী ছাড়াও গুম, খুনের শিকার নেতাকর্মীদের পরিবারের কাছে যাচ্ছেন। দিচ্ছেন পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি; পৌঁছে দিচ্ছেন ঈদসামগ্রীও। জনসংযোগের পাশাপাশি যোগ দিচ্ছেন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোয়। ইফতার ও তাফসির মাহফিলে অংশ নিয়ে ঐক্য ও শান্তির বার্তা দেওয়ার সঙ্গে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতিও।
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে ঈদ উপহার নিয়ে ইতোমধ্যে তৃণমূলে রয়েছেন বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। গণমাধ্যমের সম্পাদক, কূটনীতিকসহ বিশিষ্টজনদের মাঝে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা কার্ড ও মিষ্টান্ন পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দীর্ঘসময় ধরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন-সংগ্রামে গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের খোঁজ নিতে ও তাদের পরিবারের সদস্যদের পাজামা-পাঞ্জাবি ও শাড়ি উপহার দিতে কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে টিম গঠন করা হয়েছে। এ কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ নামক একটি সংগঠন।
ঈদে বিএনপির বিশেষ বার্তার কথা জানিয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, এবারের ঈদে বিএনপির বার্তা
হলো- নেতাকর্মীরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদ উদযাপন করবেন। বিশেষ করে ত্রয়োদশ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট নিয়ে যেন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ-সংঘাত না ঘটে, সেই বিষয়ে কথাবার্তায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। দলের ইমেজ ও জনসম্পৃক্ততায় আমাদের কথাবার্তা এবং আচরণে মানুষ যেন কষ্ট না পায়। জনগণের পাশে থাকতে হবে। এটিই আমাদের দলীয় বার্তা।
বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ‘ভূমিধস জয়’ অর্জনের ফলে এই ঈদে বিএনপি নেতাকর্মীদের মনে এক ধরনের রাজনৈতিক বৈধতা এনে দিয়েছে। যে মানুষটি গত ১০ থেকে ১৫ বছর ঈদে বাড়ি ফিরতে পারেনি, তার কাছে এই বাড়ির বারান্দায় বসে থাকাটাই এক বিরাট বিপ্লব। ঈদের দিনটিতেও নেতাকর্মীরা নিজের বাড়িতে ঘুমাতে পারতেন না। এবারের ঈদ তাই আন্দোলনের প্রস্তুতির নয়, বরং এক দীর্ঘ লড়াইয়ের পর বিজয়ের আনন্দ ভাগাভাগি করার। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের শুরু পর্যন্ত সময়কালটি বিএনপির জন্য ছিল এক অগ্নিপরীক্ষার মতো।
এদিকে, আন্দোলনের পরিবর্তে এখন বিএনপির পাড়ায় পাড়ায় প্রধান আলোচ্য বিষয় ঈদের আনন্দ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, বগুড়া থেকে বরিশাল, সিলেট থেকে খুলনা- সব স্থানেই বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। যে পুলিশ আগে তাড়া করত, সেই পুলিশ এখন তাদের প্রটোকল দিচ্ছে। ক্ষমতার আনন্দ যেন দম্ভে রূপ না নেয়, সে বিষয়েও সজাগ থাকতে বলছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা। নেতারা বলছেন, এবারের ঈদ বিএনপিকে সুযোগ করে দিয়েছে দীর্ঘ ১৬ বছরের বঞ্চনা কাটিয়ে ওঠার এবং সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার।
গুম-খুন আর নির্যাতনের সেই বিভীষিকা পেছনে ফেলে ২০২৬ সালের এই ঈদ উদযাপন হয়ে থাকবে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মাইলফলক। আন্দোলন শেষ হয়েছে, এবার সময় উন্নয়নের এবং মানুষের মুখে স্থায়ী হাসি ফোটানোর। গুম হয়ে যাওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারগুলোর চোখের জল হয়তো পুরোপুরি শুকাবে না, তবে স্বাধীন দেশে নিজের এলাকায় নিরাপদে ঈদ পালন করতে পারার স্বস্তিই এখন বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় উপহার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঈদকে কেন্দ্র করে মুক্ত পরিবেশে নির্বাচনী বার্তা নিয়ে তৃণমলে যাচ্ছে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা ও সংসদ সদস্যরা। বৃহৎ এই উৎসবকে ঘিরে নানা আয়োজনে দলের ইমেজ ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে ইতোমধ্যে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাদের। নির্দেশনা পেয়ে কেন্দ্রীয় নেতা ও সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা এ ঈদকে বেছে নিয়েছেন গণসংযোগের সুযোগ হিসেবে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, এবারের ঈদুল ফিতর বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে এক ভিন্ন অনুভূতি তৈরি করেছে। এর আগে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সময়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা হয় জেলে, না হয় আত্মগোপনে ঈদ উদযাপন করেছেন। অনেকেই ১০-১২ বছর ধরে নিজের এলাকায় পর্যন্ত যেতে পারেননি। গত বছরের বিপ্লবে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর বিরোধী রাজনীতিতে স্বস্তি নেমে আসে। সেই স্বস্তি নিয়ে উদযাপিত হবে এবারের ঈদ। তৃণমূলের এই স্বস্তিই বলে দিচ্ছে, এবারের ঈদ বিএনপির জন্য কতটা আলাদা।
মুক্ত পরিবেশে ঈদ উদযাপনের কথা জানিয়ে ময়মনসিংহ-১০ আসনের সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, মামলা নিয়ে বিগত বছরগুলোতে কখনও জেলে, কখনও ফেরারি জীবনে আমাকে থাকতে হয়েছে। কিছুদিন কারাগারে কাটিয়েছি। কিন্তু এখন আর সেই অবস্থা নেই। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে সব সময়ে চাওয়া ছিল- দলের নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়াকে প্রাধান্য দিতে। কিন্তু বিগত স্বৈরাচার সরকারের কারণে সেটা এতদিন হয়ে ওঠেনি। এবার সেটা পুষিয়ে নিতে দিনরাত একাকার করে কাজ করছি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির ঈদ মানেই ছিল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, হুলিয়া এবং পুলিশি তল্লাশির আতঙ্ক। ঈদগাহে যাওয়ার চেয়ে আদালতপাড়ায় হাজিরা দেওয়া ছিল তাদের নিয়মিত রুটিন। রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি বারবার অবরুদ্ধ হয়েছে, কলাপসিবল গেটে ঝুলেছে বড় তালা। ঈদ উপলক্ষে দলটির তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে যে শুভেচ্ছা বা সৌজন্য সাক্ষাতে আয়োজন থাকত, তাও কখনও কখনও পণ্ড হতো গোয়েন্দা নজরদারি আর ধরপাকড়ে। এবার ঈদ উপলক্ষে সৌজন্য সাক্ষাতের আয়োজন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারের ঈদ কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য দীর্ঘদিনের মানসিক ট্রমা থেকে মুক্তির এক মহোৎসব।
এদিকে এত আনন্দের মাঝেও ‘গুম’ হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারদের দীর্ঘশ্বাস বিদ্ধ করছে বিএনপিকে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও গুম হয়ে যাওয়া সেই মানুষগুলো আর ফিরে আসেননি। গুম হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারগুলোর জন্য ঈদ এখনও কান্নার নাম। নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা এখন জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে থাকলেও, ঈদের সকালে ইলিয়াস আলীর অনুপস্থিতি তাকে বেদনাক্রান্ত করবে। তেমনি চৌধুরী আলমের পরিবারের মতো আরও অনেক স্বজনহারা পরিবার আজও তাদের প্রিয়জনের ফেরার পথ চেয়ে বিষণ্ন মনে ঈদ কাটাচ্ছে। এই ক্ষতগুলো উপশম করা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
