

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের এক প্রকল্পে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করা, বিধি মেনে কাজ না করা ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারসহ প্রকল্পের নানা অনিয়মের ফিরিস্তি উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে। সুবিধাভোগীরা ঠিকমতো সেবা পাচ্ছেন কি না, তা দেখার জন্য আইএমইডি এই প্রতিবেদনটি তৈরি করে। তাতেই ধরা পড়েছে সব অনিয়ম।
এই প্রতিবেদনে ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন এবং স্বাস্থ্যবিধি প্রকল্পে’র আওতায় নির্মাণ করা ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও মুক্তাগাছা উপজেলার পাবলিক টয়লেটের একটি চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, কোনো কোনো টয়লেটে এত ময়লা ও দুর্গন্ধ যে ঢোকাই দায়। কোনো কোনোটার ভেতরে বিভিন্ন জায়গার টাইলস ভেঙে গেছে। নির্মাণকাজের ত্রুটির কারণে কোনোটির মেঝে দেবে গেছে। কোনোটির দরজা খোলা যায় না, ঘরভর্তি মাকড়সার জাল।
প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়েছে, নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে হতদরিদ্রদের জন্য টুইন পিট ল্যাট্রিন তৈরি করা হয়েছে। কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) ছাড়াই ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর সরকার ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ স্যানিটেশন স্বাস্থ্যবিধি’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। সেসময় প্রকল্পটির খরচ ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা।
প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে। দেশের আট বিভাগের ৩০ জেলার ৯৮টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নামে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রকল্পের আওতায় গ্রামের বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ (বড় স্কিম স্থাপন), পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ (ছোট স্কিম স্থাপন), স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট স্থাপন, কমিউনিটি ক্লিনিকে নতুন স্যানিটেশন এবং হাইজিন সুবিধা, হাত ধোয়ার স্টেশন, হতদরিদ্র পরিবারের জন্য পিট ল্যাট্রিন স্থাপন করার কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ এ সময়ে সন্তোষজনক কাজ হয়নি।
যেগুলো হয়েছে সেগুলোর বেশির ভাগ ক্রটিপূর্ণ।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইএমইডির সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকজন অভিযোগ করেন, ইচ্ছা করেই প্রকল্প পরিচালক নিয়মকানুন মানেনি। নানা অনিয়ম করেছেন।
ময়মনসিংহ, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। নানা গলদ ধরা পড়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী তবিবুর রহমান বলেন, ‘এর কারণ আমার জানা নেই।’
তিনি বলেন, ‘সবকিছু জানা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। যেখানে যেখানে ক্রটি পাওয়া গেছে, গলদ ধরা পড়েছে, সে বিষয়ে ঠিকাদারদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
এ প্রকল্প নিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘মন্তব্য করার কোনো ভাষা নেই। তার পরও বলব এই প্রকল্পে গলদ থাকলে বিশ্বব্যাংক দায় এড়াতে পারে না। কারণ তাদের তো টিটিএল (টাস্ক টিম লিডার) থাকার কথা। অফিসের মতো ফিল্ডেও তিন থেকে ছয় মাস পরপর সুপারভিশন ও ভিজিট করার কথা। ঋণ ফেরত পাওয়ার জন্য হলেও দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করার কথা। পরিকল্পনা কমিশনও দায় এড়াতে পারে না। কারণ প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ফিজিবিলিটি স্টাডি ছিল না। তার পরও কেন যে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ও দায় এড়াতে পারে না। সবাই সজাগ থাকলে এত অনিয়ম হতো না।’
বিভিন্ন জেলায় কাজের অনিয়ম
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুমিল্লা ও পাবনা জেলায় সঠিকভাবে পাবলিক টয়লেট স্থাপন করা হলেও অধিকাংশ জেলায় এ কাজে গলদ পাওয়া গেছে। জামালপুরে বাসাবাড়িতে পানি সরবরাহের জন্য জলাশয় ভরাট করে পানির পাইপ টানা হয়। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। চট্টগ্রামে স্পেসিফিকেশন (শর্ত) অনুযায়ী ল্যাট্রিন তৈরি করা হয়নি। মৌলভীবাজারের সদর উপজেলা ও রাজনগর উপজেলায় বিভিন্ন কাজে অনিয়ম দেখা গেছে। পানি সরবরাহের জন্য মাটির তিন ফুট নিচে পাইপলাইন স্থাপন না করে নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে মাটির ওপর দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ছোট পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে (ছোট স্কিম) মাটির মাত্র তিন ইঞ্চি নিচে নিম্নমানের পাইপ বসানো হয়েছে, এর ওপর কোনো বালি দেওয়া হয়নি। নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে। মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে হাত ধোয়ার স্টেশন করা হলেও তা ব্যবহার হয় না। ইউনিয়ন পরিষদে যে পাবলিক টয়লেট তৈরি করা হয়েছে, তা বন্ধ থাকে। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে অনেক দূরে ডোবায় পাবলিক টয়লেট করা হয়েছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলায় প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে একটি হাত ধোয়ার স্টেশন করা হলেও কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে না দেওয়ায় তা ব্যবহার হচ্ছে না।
বাসাবাড়িতে পানি সরবরাহের জন্য নকশা অনুযায়ী মাটির তিন ফুট নিচে পাইপ বসানোর কথা থাকলেও ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল ও মুক্তাগাছা উপজেলায় মানা হয়নি এই শর্ত। ছয় ইঞ্চি নিচ দিয়ে নিম্নমানের পাইপ স্থাপন করা হয়েছে। কোথাও মাটির ওপর দিয়ে, কোথাও মাটির তিন ইঞ্চি নিচে পাইপ বসানো হয়েছে। পিট ল্যাট্রিনে খুবই নিম্নমানের কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও কোথাও বাড়ি থেকে অনেক দূরে ল্যাট্রিন স্থাপন করা হয়েছে। ত্রিশালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম একাডেমি মাঠের পাশের পাবলিক টয়লেটের টাইলস ভেঙে গেছে। মুক্তাগাছা সরকারি পশুর হাটের পাবলিক টয়লেটের গুণগত মান খারাপ হয়েছে।
বরিশালের হিজলা ও আগৈলঝাড়া উপজেলায় বাসাবাড়িতে পানি সরবরাহের ছোট স্কিমেও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী পাইপ দেওয়া হয়নি। মাটির মাত্র ৯ ইঞ্চি নিচে নিম্নমানের পাইপ বসানো হয়েছে। পানির এ সংযোগ পেতে কারও কারও টাকা খরচ হয়েছে। দুই পিন প্লাগ না দিয়ে সকেটে সরাসরি তার ঢুকিয়ে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। হিজলার মেঘনাঘাটের পাশে পাবলিক টয়লেটের র্যাম্প বেশি উঁচু করায় সাধারণ মানুষ সেখানে যেতে পারেন না।
এ ছাড়া ৩০টি উপজেলার ১৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মূল ভবন থেকে অনেক দূরে পাবলিক টয়লেট স্থাপন করায় সেগুলো ব্যবহার হয় না। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার অধিকাংশ পাবলিক টয়লেটে বিদ্যুৎ-সংযোগ নেই। ১৫ জেলার বাজার, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও মসজিদে ২৭টি জনসমাগম স্থানে হাত ধোয়ার স্টেশন করা হলেও সেগুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফেনী, ময়মনসিংহ ও মৌলভীবাজার জেলায় পুকুর ও জলাশয় ভরাট করে পানির বড় স্কিমের কাজ করা হয়েছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের ঋণে ২০২১-এর জানুয়ারিতে শুরু করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল প্রকল্পটির। অথচ গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৪৬ শতাংশ। প্রধান কার্যালয়ের সাতজন অভিজ্ঞ পরামর্শকের পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ২৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটির শুরু থেকে এ পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালকের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন প্রকৌশলী মো. তবিবুর রহমান তালুকদার। প্রকল্পটি ঠিকমতো বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা দেখভাল করার জন্য বছরে চারটি করে পিআইসি ও পিএসসি সভা হওয়ার কথা। কিন্তু কোনো বছরই এ সভাগুলো ঠিকমতো হয়নি। এ পর্যন্ত দুবার অডিট হয়েছে। তাতে ছয়টি বিষয়ে ৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার অডিট আপত্তি আছে।
প্রকল্প সংশোধন করে কমানো হয় কাজের পরিধি: প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়েছে, প্রকল্পটির খরচ না বাড়িয়ে কমানো হয়েছে বিভিন্ন কাজের পরিধি। যেমন—পানির বড় স্কিম ৭৮টির পরিবর্তে ৫৪টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই বড় স্কিমের প্রতিটিতে খরচ ৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ধরা হলেও খরচ বাড়িয়ে ৫ কোটি ৫৯ লাখ ১৩ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রতিটি বড় স্কিমে ৩৫০ থেকে ৭০০ পরিবারকে পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহের কথা বলা হয়।
ছোট স্কিম ৩ হাজার ৩৬৪টি থেকে কমিয়ে ৩ হাজার ২৭৮টিতে আনা হয়। এতে ৩০ থেকে ৪০টি পরিবারকে নিরাপদ পানি সরবরাহ করার কথা বলা হয়। হতদরিদ্রদের জন্য উন্নত মানের টুইন পিট ল্যাট্রিন ৩ লাখ ৫১ হাজার ২৭০টির পরিবর্তে ২ লাখ ২০ হাজার ৮৭৪টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। প্রতিটি টুইন পিট ল্যাট্রিনের খরচ ধরা হয়েছিল ২২ হাজার টাকা। পরে এই খরচ বাড়িয়ে ৩৫ হাজার ১০৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

