ঢাকা
২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ১০:০২
logo
প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬

ক্ষমতায়ন নয়, বিতর্কের হাতিয়ার বলছেন বিশ্লেষকেরা

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম থাকা নিয়ে বিতর্কের আলোচনা দ্রুত রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক বাকযুদ্ধে। নারী অধিকার বা রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নয়, বরং নারীকে ঘিরে অবমাননাকর বক্তব্য ও পারস্পরিক দোষারোপই এখন নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পাল্টাপাল্টি অবস্থানে নারী ইস্যু যেন ভোটের রাজনীতিতে একটি বিতর্কিত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, নারীর বাস্তব অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে, আর রাজনীতিতে নারীকে কেবল ব্যবহারযোগ্য বিষয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে এই বিতর্কের সূত্রপাত মূলত জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের একটি সাক্ষাৎকার থেকে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, আসন্ন নির্বাচনে তার দল থেকে একজন নারী প্রার্থীও মনোনয়ন পাননি। তবে ভবিষ্যতে নারী নেতৃত্ব তৈরির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে জামায়াতের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে নারী আসতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এটি সম্ভব নয়।’

এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘আল্লাহ প্রত্যেককে তার নিজস্ব সত্তায় সৃষ্টি করেছেন। একজন পুরুষ কখনো সন্তান ধারণ করতে পারবে না বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে না। আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, আমরা তা পরিবর্তন করতে পারি না।’

ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে, যেগুলোর কারণে তারা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিছু শারীরিক অসুবিধা আছে, যা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন, তিনি কীভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন? এটি সম্ভব নয়।’

এই বক্তব্য প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এর মধ্যেই অভিযোগ ওঠে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট থেকে কর্মজীবী নারীদের নিয়ে অবমাননাকর একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি সামনে আসতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

জামায়াতের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে দাবি করা হয়, ডা. শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ওই পোস্ট দেওয়া হয়েছে।

পরে এ বিষয়ে বিবৃতি দেওয়া হলেও বিতর্ক থামেনি। উভয় পক্ষ আলাদাভাবে সংবাদ সম্মেলন করে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে।

নারীকে রাজনীতিতে ‘ব্যবহার’ করা হচ্ছে মন্তব্য করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, পুঁজিবাদ ও পুরুষতান্ত্রিকতা কীভাবে লিঙ্গবৈষম্যকে ধারণ করে, তা প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

তিনি বলেন, ‘কেউ হয়তো সরাসরি নারীর বিরুদ্ধে কথা বলছে, আবার কেউ রাজনৈতিক প্রচারণার কারণে পরোক্ষভাবে পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। অথচ নারীর বিষয়ে কথা বলতে হলে সিডও সনদ, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, সম্পত্তির অধিকার, বাল্যবিবাহ, সহিংসতা ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে হবে।’

ফওজিয়া মোসলেমের মতে, এসব ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো দৃশ্যমান অবস্থান নেই। ‘তারা কথা বলছে—নারীকে কোলে রাখব না মাথায় রাখব। অথচ নারী কোলে বা মাথায় নয়, সমান তালে পাশে থাকতে চায়। এটা বুঝতে হবে। অধিকার দিতে হবে। সেই অধিকারের প্রশ্নে আপনাদের কর্মসূচি কী, সেটাই বলা দরকার,’ বলেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, নারীকে এখন রাজনীতিতে স্পষ্টভাবেই ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে নারীরা কীভাবে ট্রিটমেন্ট পাচ্ছেন, তা এখন আর লুকানো কিছু নয়—খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন সামনে থাকায় এ ট্রিটমেন্টের রাজনৈতিক দিকটি আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সমাজের প্রতিটি সেক্টরেই নারীরা এখন ভালনারেবল অবস্থায় রয়েছেন। যেন আবারও একটি সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে—নারীকে ঠেলে পেছনে পাঠানোর।’

তানিয়া হকের মতে, এত বছর পেরিয়েও রাজনীতিতে প্রকৃত কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ছে না। তিনি বলেন, ‘রাজনীতির জায়গাটি এতটাই নোংরা ও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে যে সেখানে টক্সিক ম্যাসকুলিনিটি, মাসল পাওয়ার এবং শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি প্রাধান্য পাচ্ছে। উদ্দেশ্য যেন জায়গাটাকে আরও দূষিত করা, যাতে সেখানে নারীর কোনো অস্তিত্বই না থাকে।’

এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, যারা বর্তমানে ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় আছেন, তাদের আরও সক্রিয় ও দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করা উচিত। নারীর বিষয়টি যখন বারবার ‘ইস্যু’ হিসেবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন তা সভ্য সমাজের সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সবাই মানুষ—কিন্তু মানুষ হিসেবে নারীরা কবে সম্মানজনক ট্রিটমেন্ট পাবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়, বলেন তিনি।

জামায়াত আমিরের মন্তব্য প্রসঙ্গে তানিয়া হক বলেন, তাকে ব্যক্তি হিসেবেও দেখা যেতে পারে এবং তার দলের সবাই একই মানসিকতা পোষণ করেন কি না, সেটিও নিশ্চিত নয়। ‘বাংলাদেশে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ নেতিবাচক চিন্তা পোষণ করতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—বাকি মানুষ কোথায়? তারা কেন কথা বলছে না? এখানেও রাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি,’ যোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, যদি এসব বক্তব্য রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিফলিত করে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে আরও বেশি চিন্তার বিষয় হলো—যেসব দল নারী নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করছে, তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের পক্ষ থেকে কেন কোনো প্রতিক্রিয়া আসছে না। তাদের উচিত এসব বক্তব্যের প্রকাশ্য প্রতিবাদ করা। কারণ রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম দায়িত্ব হলো মানুষকে নিরাপদ রাখা।

সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তানিয়া হক বলেন, সরকার কেন এ বিষয়ে জোরালোভাবে কথা বলছে না? নারীর বিরুদ্ধে অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তার মতে, রাষ্ট্র যদি এখনই স্পষ্ট অবস্থান না নেয়, তাহলে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা আরও গভীর সংকটে পড়বে।

নারী অধিকার কর্মীরা বলছেন, নারী ইস্যুতে তর্কে জড়ানো রাজনৈতিক দলগুলো সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় শুরু থেকেই মতৈক্য ছিল না। কোনো রকমে আলোচনায় সংসদ নির্বাচনে অন্তত ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রস্তাবে তারা সম্মত হয়। নারী অধিকারকর্মীরা এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত এবারের নির্বাচনে ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের বিধান রেখে জুলাই সনদ চূড়ান্ত করা হয়। তবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কোনো দলেই প্রতিফলিত হয়নি। বিএনপি ৪ দশমিক ১ শতাংশ নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী কোনো আসনেই নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। জাতীয় পার্টি ১৯৮ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দিলেও নারী প্রার্থী মাত্র ছয়জন, অর্থাৎ মোট মনোনয়নের মাত্র ৩ শতাংশ।

পাশাপাশি আসন সমঝোতার প্রক্রিয়ায় প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একজন এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) তিনজন নারী প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেয়।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram