

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথে নেমেছিলেন শ্রীপুরের যুবক মো: শাকিল। ৫ আগস্ট মাওনা এলাকায় কোমরে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। অভ্যুত্থানের এগারো মাসেও উন্নত চিকিৎসা, সরকারি অনুদান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস কিংবা মন্ত্রণালয়ের গেজেট কোথাও যায়গা হয়নি তার।
এই সময়ে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন মো. শাকিল।
একমাত্র সন্তানকে নিয়ে স্ত্রী চলে গেছেন। চিকিৎসা ওষুধপত্রের পেছনে খরচা মিলিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকার মতো ঋণগ্রস্ত বলে জানান তিনি। ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু টাকা সহায়তা পেলেও সরকারি কোনো সহায়তা তিনি পাননি।
শাকিল বলেন, 'আমার লাইফটাই এলোমেলো হয়ে গেছে।
আমার সংসারটা এলোমেলো হয়ে গেছে। সবকিছু শেষ। আমার সব শেষ।'তিনি জানান, ৫ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তার চিকিৎসা হয়েছে।
সেখান থেকে সেপ্টেম্বর মাসে তাকে রিলিজ দেওয়া হয়। কিন্তু তার শরীর থেকে গুলিটি বের করা হয়নি। কেন বুলেট এখনো রয়ে গেছে, সে প্রশ্নে চিকিৎসকরা তাকে বলেছিলেন, গুলি বের করা সম্ভব না এতে তার স্থায়ী পঙ্গু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। শাকিল জানান, চলাফেরা করতে পারলেও ভারী কাজ করতে পারেন না। ইদানীং গুলির কারণে সমস্যা বাড়ছে।
উন্নত চিকিৎসা পেলে গুলিটি বের করা যায় কিনা এই ভাবনাও আছে তার। শাকিল বলেন, সবকিছু মিলে খুব ভোগান্তির মধ্যে আছি। আর্থিকভাবে, পারিবারিকভাবে- আমি খুব সমস্যার মধ্যে আছি। আমার বউ চলে গেছে। ভাবছে আমার শরীরে গুলি বের করতে পারি নাই। আমার একটা ছেলেকে নিয়ে সে আলাদা হয়ে গেছে।
শাকিলের বিষয়টি নিয়ে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব আহমেদ বলেন, শাকিলের আহত হওয়ার বিষয়টি প্রশাসন জানে। কিন্তু তার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি বলেই তালিকায় নাম আসেনি। তবে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে জুলাই আন্দোলনে আহতদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রচার করেছিল বিবিসি বাংলা, সেখানে শাকিলের সমস্যা- সংকটের বিবরণ ছিল।
ওই খবরের পর তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন উপজেলার ছাত্র প্রতিনিধিরা। শাকিল তাদেরকে কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় জুলাই আন্দোলনে আহতদের তালিকাভুক্তির জন্য তথ্য যাচাই বাছাইয়ের দায়িত্বে আছেন আহত রফিকুল ইসলাম রায়হান। পাঁচই অগাস্ট রায়হানও পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন গাজীপুরের মাওনা এলাকায়। একই ঘটনাস্থলে গুলিবিদ্ধ শাকিল কেন সরকারি তালিকায় নেই, এ প্রশ্নে রায়হান বলছেন, কাগজপত্র দেওয়ার পর আর যোগাযোগ করেননি যে কারণে তার নামটি হয়তো তালিকায় স্থান পায়নি। যদিও শাকিল বলছেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কাগজপত্র চাইলে তিনি গত বছর সেগুলো একজন ছাত্রের কাছে দিয়েছিলেন।
একদিকে শাকিলের মতো জুলাই আন্দোলনে আহতরা যেমন কোনো সহায়তা পাননি, আবার অনেকে একাধিকবার সহায়তা পেয়েছেন। এখন তারা আরো সহায়তা, উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া এবং আহতদের শ্রেণী বা ক্যাটাগরির পরিবর্তনের জন্য চেষ্টা করছেন। আহতদের একটি অংশের দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। চক্ষু বিজ্ঞান হাসপাতাল এবং ঢাকার অর্থোপেডিক হাসপাতালে আহতদের আন্দোলন খবরের শিরোনাম হয়েছে।
এখনো ঢাকার অর্থপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান বা পঙ্গু হাসপাতালে দশজন আহত ভর্তি রয়েছেন। কিন্তু তাদের এ অবস্থায় থাকার প্রয়োজনীয়তা কতটা- সে প্রশ্ন আছে খোদ আহতদের মধ্যে। শ্রীপুরের রায়হানও পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, জুলাই আহতদের একটি অংশ হাসপাতালে বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছেন, এটি তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। তার ভাষায় যারা হাসপাতালে সিট নিয়ে ভর্তি আছেন তাদের বেশিরভাগেরই আর থাকার প্রয়োজন নেই।
হাসপাতালের চিকিৎসকদের ভাষায় তাদের সবার অবস্থাই এখন স্থিতিশীল। জাতীয় অর্থপেডিক হাসপাতালের পরিচালক মো: আবুল কেনান বলেন, 'আমরা জুলাই যোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু একটা জাতীয় প্রতিষ্ঠান একটা জরুরি হাসপাতালে যেখানে সারা দেশ থেকে রোগী আসে এবং তারা অনেকেই বিছানা পায় না। এরকম একটা জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী অকুপাই করা যুক্তিসঙ্গত নয়।'
