ঢাকা
logo
প্রকাশিত : July 22, 2026

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে এস আলমের সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা পাচারের তথ্য

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পতন হওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা বড় আকারের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের প্রধান শিকার হয়েছে। এ সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে দেশের ৭টি ব্যাংক ও ১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল এস আলম গ্রুপ। এরপর কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, নামমাত্র জামানতে নামে-বেনামে প্রায় সোয়া ২ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করেছে শিল্পগোষ্ঠীটি।

বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে এই অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ‘এস গ্রুপ’ ছদ্মনামে কেস স্টাডি হিসেবে এই তথ্য তুলে ধরে বিএফআইইউ। পরে সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে ‘এস গ্রুপ’ ছদ্মনামে যে কেস স্টাডি প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে সেটি এস আলম গ্রুপ।

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণের নামে ব্যাংক লুট আর হুন্ডি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে চার দেশে এস আলম গ্রুপের অর্থ পাচারের এই ঘটনা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও পদ্ধতিগত ব্যর্থতার চরম দৃষ্টান্ত। এই অর্থ পাচারে কয়েকটি কৌশল ব্যবহার করেছে অপরাধীরা। এর মধ্যে রয়েছে—ব্যাংকের তহবিলের অপব্যবহার, বন্ডের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, সরকারি পদের অপব্যবহার ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের কারসাজি।

বিএফআইইউ প্রতিবেদনে বলেছে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় ব্যাংক কেলেঙ্কারির সাক্ষী হয়েছে। এই আর্থিক কেলেঙ্কারির মূলে ছিল জালিয়াতিপূর্ণ ঋণ, নিয়ন্ত্রণমূলক আইন লঙ্ঘন, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যাংকিং কাঠামোর পদ্ধতিগত কারসাজি। ‘এস গ্রুপ’ রাজনৈতিক সমর্থনকে পুঁজি করে এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আইনকে পাশ কাটিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক অনিয়ম, জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল।

  • রাজনৈতিক ক্ষমতা ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে দেশের ৭টি ব্যাংক ও ১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেয়। * নামে-বেনামে মোট ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়। * মোট ঋণের মধ্যে ৯০ হাজার কোটি টাকা ৪৩টি সরাসরি প্রতিষ্ঠানের নামে এবং ৯৮ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয় বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। * ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে গ্রুপটির রাখা বন্ধকির বাজারমূল্য ছিল মাত্র ৩২ হাজার কোটি টাকা। * হুন্ডি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ট্রাস্ট অ্যাকাউন্টের আড়ালে এসব অর্থ পাচার করা হয়। * সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সাইপ্রাস ও ইউএই–তে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। * গ্রুপটির মূল ব্যক্তিরা তিনটি ভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন।
  • আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ দখল

প্রতিবেদনে বলা হয়, এস গ্রুপের পরিবারের সদস্যরা সুপরিকল্পিতভাবে দেশের ৭টি ব্যাংক ও ১টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয়। পরে তারা নিজেদের বিশ্বস্ত পারিবারিক সদস্য ও অনুগত সহযোগীদের এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে বসায়। এর মাধ্যমে গ্রুপটি ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। এমনকি দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নেয় গ্রুপটি, যেখানে তারা একটি সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা এবং উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সংযোগের প্রভাব ব্যবহার করেছিল। ব্যাংকের পর্ষদের নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে গ্রুপটি অভ্যন্তরীণ নিয়মকানুনও নিজেদের মতো করে পরিবর্তন করে। একই সঙ্গে কোনো ধরনের নজরদারি ছাড়া নিজেদের ও সহযোগীদের নামে একের পর এক ঋণ অনুমোদন করিয়ে নেয়।

ভুয়া কোম্পানি খুলে অর্থ লুট

বিএফআইইউর কেস স্টাডিতে বলা হয়েছে, ব্যাংকগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর এসব ব্যাংক থেকে ঋণের নামে অর্থ লুট শুরু করে এস আলম গ্রুপ। এ জন্য বৈধ ব্যবসার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক কাল্পনিক বা ভুয়া (শেল) কোম্পানি খুলে সেগুলোর নামে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয়। এসব ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই করা হয়নি। এস আলম গ্রুপ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলো থেকে নামে-বেনামে ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে ৯০ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে ৪৩টি প্রতিষ্ঠানের নামে। ৯৮ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে। আর অবশিষ্ট ৩৭ হাজার কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে অন্যান্য মাধ্যমে।

বিএফআইইউ বলছে, নামমাত্র বা অপর্যাপ্ত বন্ধকি বা জামানতের বিপরীতে এই বিপুল পরিমাণ ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছিল। মোট ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে ব্যাংকে জমা বন্ধকি সম্পদের (জামানত) বাজারমূল্য ছিল মাত্র ৩২ হাজার কোটি টাকা। ঋণের অঙ্কের তুলনায় জামানতের এই বিশাল ব্যবধান দেশের ঋণের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থার পদ্ধতিগত ব্যর্থতার এক চরম ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।

হুন্ডি ও বাণিজ্যের আড়ালে পাচার

ব্যাংক থেকে লুট করে নেওয়া বিপুল অর্থ অত্যন্ত জটিল মানি লন্ডারিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে জানায় বিএফআইইউ। সংস্থাটি বলেছে, অর্থ স্থানান্তরের জন্য এস আলম গ্রুপ মূলত বিভিন্ন ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম ব্যবহার করেছে। বিএফআইইউ আরও জানায়, গ্রুপটি সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সাইপ্রাস ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো বিভিন্ন দেশে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছে পাচারের অর্থে। একই সঙ্গে শিথিল আর্থিক তদারকির জন্য পরিচিত বিভিন্ন অফশোর অঞ্চলের সঙ্গেও এস আলম গ্রুপের শক্তিশালী সংযোগ ছিল। এ ছাড়া গ্রুপটির সঙ্গে যুক্ত মূল ব্যক্তিরা তিনটি ভিন্ন দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। এটি পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার আইনি প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। তাদের বিদেশি উদ্যোগগুলো (ফরেন ভেঞ্চার) মূলত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, হুন্ডি ও প্রবাসী আয় সেবার আড়ালে এই অবৈধ অর্থ পাচারের নিরাপদ গন্তব্য তৈরির কাজ করেছিল।

বিএফআইইউর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে গত শনিবার প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এস আলম গ্রুপের কাছে ই–মেইলের মাধ্যমে তাদের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। তবে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি এই ই–মেইলের কোনো উত্তর দেয়নি। ফলে পাচারের বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা যায়নি।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram