

বাংলাদেশ ও এদেশের মানুষের পরিচয় তার নদ-নদীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের বিশাল অববাহিকাজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা হাজারো নদ-নদী, খাল-বিল কেবল এ দেশের ভূখণ্ডকে সিক্ত করেনি; শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে নদীই হয়ে উঠেছে তাদের জীবনরেখা। এ কারণেই বাংলাদেশকে বলা হয় ‘নদীমাতৃক দেশ’। ভূ-প্রকৃতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জনজীবন—সবকিছুই প্রায় ১,৪০০ নদ-নদীর এক সুবিশাল জালিকার ভেতর দিয়ে বিকশিত হয়েছে। নদীকেন্দ্রিক এই বাস্তবতা থেকেই গড়ে উঠেছে নৌকাবাইচ, গ্রামীণ হাট-বাজার, লোকজ সংস্কৃতি এবং এক বিশেষ সভ্যতা।
বাংলাদেশের নদীপথ কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কয়লা, সার, খাদ্যশস্যসহ ভারী পণ্য পরিবহনে নৌপথ সড়ক ও রেলের তুলনায় ৩০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব। চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহন এবং নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ ও বাঘাবাড়ীর মতো নৌবন্দরগুলোর বাণিজ্যিক বিকাশে নদীপথের ভূমিকা অপরিসীম। নদী সেচ ও পলিমাটির মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন টিকিয়ে রাখে এবং নদী-জলাশয়ভিত্তিক মৎস্য কার্যক্রম দেশের জিডিপিতে প্রায় ৩.৬১ শতাংশ অবদান রাখছে।
তবে এই বিস্তৃত জলপথে স্থলভিত্তিক অপরাধের পাশাপাশি মাদক চোরাচালান, অবৈধ বালু উত্তোলন ও নৌযানকেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধও সংঘটিত হয়, যা অনেক সময় দুর্গম চরাঞ্চলের কারণে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এই বাস্তবতায় নদীপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট নৌ পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সীমিত জনবল নিয়েও নৌ পুলিশ নদীপথের বহুমুখী অপরাধ দমন করে যাত্রী, জেলে ও নদীতীরবর্তী মানুষের মাঝে নিরাপত্তা ও আস্থার অনুভূতি জোরদার করছে।
নৌ পুলিশ গঠনের শুরুর দিকের কথা
নৌ পুলিশ গঠনের প্রেক্ষাপট ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ জলপথে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার এক কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ; বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী বর্ষাকালে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথের মোট দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ প্রায় ৬,৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়, আর শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ৪,৫০০ কিলোমিটার নৌপথ ব্যবহারযোগ্য থাকে। এই সুবিস্তৃত নৌপথ যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হিসেবে কাজ করে।
তবে এই বিশাল নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রচলিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পক্ষে এককভাবে কার্যকরভাবে করা কঠিন হয়ে পড়ে। নদীপথে চোরাচালান, জলদস্যুতা, মাদক ও মানব পাচার, দুর্ঘটনা এবং বিভিন্ন অপরাধের প্রকৃতি ছিল ভিন্ন ও জটিল, যার জন্য প্রয়োজন ছিল বিশেষায়িত দক্ষতা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি আলাদা ইউনিট। এই বাস্তবতা থেকেই নৌপথকেন্দ্রিক অপরাধ মোকাবিলায় একটি বিশেষ পুলিশ ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
প্রাথমিকভাবে এই ইউনিটের নামকরণ করা হয়েছিল “মেরিন পুলিশ”। তবে কার্যপরিধি ও দায়িত্বের প্রকৃতি বিবেচনায় পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে “নৌ পুলিশ” রাখা হয়। কারণ ‘মেরিন পুলিশ’ শব্দটি মূলত সামুদ্রিক ও উপকূলীয় এলাকায় পুলিশিংকে নির্দেশ করে, যেখানে ইতোমধ্যেই নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের মতো বিশেষায়িত বাহিনী দায়িত্ব পালন করে আসছে। এতে দায়িত্ব ও এখতিয়ার নিয়ে অস্পষ্টতার আশঙ্কা দেখা দেয়। অপরদিকে ‘নৌ পুলিশ’ নামটি স্পষ্টভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ নদ-নদী, খাল-বিল ও হাওরাঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বকে নির্দেশ করে, ফলে বিভিন্ন বাহিনীর কার্যপরিধি ও এখতিয়ারের সীমারেখা আরও সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালের ১২ নভেম্বর বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে নৌ পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। একজন অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শকের নেতৃত্বে ৭৪৭ জন সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৯১৩ জনে।নৌ পুলিশের কার্যক্রম একদিকে যেমন নৌপথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়, তেমনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নৌ পুলিশ উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে, দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ও সহায়তা দ্রুত পৌঁছে দিতে সহযোগিতা করে এবং মানবিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে জনগণের পাশে দাঁড়ায়।

কার্যক্রম ও দায়িত্বের পরিধি
বাংলাদেশ নৌ পুলিশের কার্যক্রম কেবল নদীপথে টহল বা অপরাধ দমনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর দায়িত্বের পরিধি বিস্তৃত, বহুমাত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত। এ ক্ষেত্রে “নৌ পুলিশ বিধিমালা, ২০২০” নৌ পুলিশের দায়িত্ব ও কার্যপরিধির একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো নির্ধারণ করেছে। বিধিমালা অনুযায়ী নৌ পুলিশের নিরাপত্তা আওতাভুক্ত এলাকা শুধু নদী অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নদীর উভয় তীর থেকে ৫০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা এবং এই পরিসরের মধ্যে সংঘটিত সকল অপরাধ নৌ পুলিশের এখতিয়ারভুক্ত।
বিধিমালার ৭ নম্বর বিধি অনুযায়ী নৌ পুলিশের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিজস্ব অধিক্ষেত্রে নৌ চলাচল, মালামাল পরিবহন, যাত্রী নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় কিংবা অবৈধ টোল আদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ; ফেরিঘাট, লঞ্চঘাট, নৌ টার্মিনাল ও
নোঙরস্থলে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা; চোরাচালান, মাদক ও মানব পাচার, অবৈধ অস্ত্র পরিবহন এবং আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাস প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ—এসবই নৌ পুলিশের মূল দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। তবে নৌ পুলিশের এখতিয়ারের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যেমন, নদীপথে টহল, অভিযান ও গ্রেফতারের দায়িত্ব নৌ পুলিশের ওপর ন্যস্ত থাকলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার তদন্ত কার্যক্রম মূলত স্থানীয় থানা পুলিশই পরিচালনা করে। ফলে নদীপথে সংঘটিত অপরাধ সম্পর্কে নৌ পুলিশ অধিক বাস্তব জ্ঞান ও প্রেক্ষাপট রাখলেও, সেই জ্ঞান সরাসরি তদন্ত প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গভাবে প্রয়োগ করার সুযোগ সবসময় থাকে না।
এছাড়া নদীর স্বাভাবিক গতিপথে বাধা সৃষ্টি, নাব্যতা হ্রাস, অবৈধ বালু উত্তোলন ও নদী দখলের মতো কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ; পরিবেশ দূষণ রোধ এবং মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ ও রক্ষার দায়িত্বও নৌ পুলিশের ওপর ন্যস্ত। নৌযানের রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস যাচাই, নৌ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা তদারকি, নৌ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, অপরাধসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও অন্যান্য ইউনিটের সঙ্গে তথ্য বিনিময়—এসবও তাদের নিয়মিত দায়িত্বের অংশ। পাশাপাশি মহাপুলিশ পরিদর্শক বা সরকারের নির্দেশে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করাও নৌ পুলিশের কার্যপরিধির অন্তর্ভুক্ত।
অর্থাৎ, বিধিমালা অনুসারে নৌ পুলিশের ভূমিকা শুধু অপরাধ দমনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নদী ও নৌপথকেন্দ্রিক একটি সমন্বিত প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনসেবা—সবকিছু একসঙ্গে পরিচালিত হয়। চোরাচালান, মাদক ও মানব পাচার, অবৈধ অস্ত্র কিংবা আন্তঃসীমান্ত জলকেন্দ্রিক অপরাধ দমনেও নৌ পুলিশের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। সামগ্রিকভাবে টহল ও অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে দেশের নদীপথকে নিরাপদ রাখা তাদের মূল লক্ষ্য।মৎস্যসম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রেও নৌ পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইলিশসহ অন্যান্য মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা বন্ধে তারা কঠোর অবস্থান নেয় এবং নিয়মিত টহল পরিচালনা করে। এই উদ্যোগ কেবল মাছ সংরক্ষণেই সহায়ক নয়; বরং হাজারো জেলের দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশ নৌ পুলিশের কার্যপরিধি বিস্তৃত এবং অপরাধের ধরন জটিল হলেও বাস্তবে তাদের সবচেয়ে বেশি হিমশিম খেতে হয় নিজেদের সীমাবদ্ধতা ও নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়। প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো জনবল সংকট। বর্তমানে প্রায় ১,৯১৩ সদস্যের এই বাহিনীকে সারা দেশের বিস্তৃত নদীপথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বিশাল এই এলাকায় টহল, তদন্ত, উদ্ধার এবং অপরাধ দমন—সব কার্যক্রমই সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা ও কনস্টেবলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অনেক ক্ষেত্রে টহল দিতে বিলম্ব ঘটে এবং অপরাধীরা সেই সুযোগ নেয়। একই সঙ্গে জরুরি সহায়তার আবেদনে দ্রুত সাড়া দিতেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।
শেষকথা
নৌ পুলিশের ভূমিকা নদীমাতৃক এই দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক অপরিহার্য অংশ। সীমিত সম্পদ ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও তারা সাহস, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের সঙ্গে জলপথের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিরলস দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। জলদস্যুতা, চোরাচালান ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মধ্য দিয়ে তারা প্রমাণ করেছে—দায়িত্ববোধই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে এই বাহিনী আরও সক্ষম হয়ে উঠবে এবং জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হবে। নদী যেমন বাংলাদেশের জীবনরেখা, তেমনি নৌ পুলিশ তার অতন্দ্র প্রহরী।
লেখক
অতিরিক্ত আইজিপি
নৌ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা
