

মো. নজরুল ইসলাম, অষ্টগ্রাম (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: নদীর জল, দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ আর রূপালি ঢেউয়ের মায়াজালে ঘেরা এক জনপদ কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম। তবে কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, ঐতিহ্যবাহী পনিরের সাথে এই হাওর উপজেলার আরেকটি বড় পরিচয় জড়িয়ে আছে এক অনন্য স্বাদ ও সুবাসে। শত বছরের প্রাচীন এই 'হোয়াইট গোল্ড' বা সাদা সোনা আজ দেশজুড়ে প্রশংসিত। গত বছর এই পনির পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের অমূল্য স্বীকৃতি, যা এই শিল্পকে নিয়ে গেছে এক আন্তর্জাতিক উচ্চতায়। কিন্তু এই জৌলুসের আড়ালে অষ্টগ্রামের পনির কারিগর ও ব্যবসায়ীদের দিন কাটছে চরম সংকট আর অস্তিত্বের লড়াইয়ে। বাইরে থেকে যা উৎসবমুখর মনে হয়, ভেতরের বাস্তব চিত্রটা আসলে নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত।
অষ্টগ্রামের পনিরের মূল প্রাণ হলো খাঁটি দুধ। সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে এই পনির বুঝি কেবল মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি। ঐতিহাসিকভাবে মহিষের দুধের পনিরের সুখ্যাতি থাকলেও, বর্তমানে চারণভূমি হ্রাসের কারণে হাওরে মহিষের সংখ্যা বেশ কম। ফলে এখন অষ্টগ্রামের পনিরের সিংহভাগই উৎপাদিত হয় গরুর খাঁটি দুধ থেকে। এই পনিরের উৎপাদন ও গবাদিপশু পালনের সাথে জড়িয়ে আছে হাওরের এক অদ্ভুত ঋতুচক্র। শুকনো মৌসুমে যখন মাইলের পর মাইল চোখ জুড়ানো সবুজ মাঠ জেগে ওঠে, তখন পশুখাদ্য বা চারণভূমির কোনো অভাব থাকে না। চারদিকে তখন দুধের প্রাচুর্য দেখা যায়। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে বর্ষাকালে। বর্ষার উত্তাল জলরাশি যখন পুরো হাওরকে গ্রাস করে, তখন চারণভূমির তীব্র সংকট দেখা দেয়। চারিদিকে শুধু পানি থাকায় গবাদিপশু নিয়ে কৃষকদের চরম বিপাকে পড়তে হয়, যার সরাসরি প্রভাব গিয়ে পড়ে পনিরের বাজারে।
বর্ষার এই সংকটের কারণে বছরের একটি দীর্ঘ সময়জুড়ে এখানে তীব্র কাঁচা দুধের সংকট দেখা দেয়। ফলে দুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় পনির উৎপাদনের খরচও হয়ে যায় আকাশচুম্বী। এই প্রাকৃতিক সংকটের সাথে যোগ হয়েছে কারিগর ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক অসচ্ছলতা। বংশানুক্রমিকভাবে এই পেশা ধরে রাখলেও অর্থনৈতিকভাবে তারা অত্যন্ত প্রান্তিক। পুঁজির অভাব এবং সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ বা সরকারি আর্থিক প্রণোদনা না থাকায় অনেকেই এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন; কেউ কেউ বাধ্য হচ্ছেন পেশা পরিবর্তন করতে।
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি বাজারজাতকরণ ও আধুনিকায়নের সমস্যাও এই শিল্পকে দারুণভাবে পিছিয়ে রেখেছে। সরাসরি ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর মতো আধুনিক সাপ্লাই চেইন বা ই-কমার্স নেটওয়ার্ক এখনো এখানে গড়ে ওঠেনি। ফলে মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের হাতে পড়ে প্রকৃত কারিগররা প্রায়শই ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এর চেয়েও বড় জটিলতা দেখা দেয় পনির সংরক্ষণের ক্ষেত্রে। কাঁচা দুধে তৈরি এই পনির অত্যন্ত পচনশীল ও সংবেদনশীল। এটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বৈজ্ঞানিক উপায়ে সংরক্ষণ করতে হয়। অথচ দুর্গম এই হাওর অঞ্চলে পনির সংরক্ষণে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এখনও পর্যন্ত কোনো হিমাগার গড়ে ওঠেনি। ফলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে পনির নষ্ট হয়ে ব্যবসায়ীদের কোটি টাকার লোকসান গুনতে হয়।
দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পনির ব্যবসার সাথে জড়িত অষ্টগ্রামের তোরাব আলী এই প্রতিনিধিকে ক্ষোভ ও আক্ষেপের সুরে জানান, পনিরের জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর আমাদের আনন্দ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এই স্বীকৃতি কেবল কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে। এই স্বীকৃতির পর বাস্তবে এ পর্যন্ত আমরা তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা বা সরকারি সাহায্য পাইনি। চারণভূমি আর হিমাগারের অভাবে দিন দিন পঙ্গু হয়ে যাচ্ছি। ঐতিহ্যবাহী এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত সরকারের কার্যকর ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
পনির ব্যবসায়ীদের এমন মাঠপর্যায়ের সংকট ও দাবির বিষয়ে কথা হয় স্থানীয় প্রশাসনের সাথে। অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিলভিয়া স্নিগ্ধা এ প্রসঙ্গে বলেন, "আমরা পনিরের এই প্রাচীন ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। ইতিমধ্যেই পনির ব্যবসায়ীদের সাথে সরাসরি কথা বলে তাদের বিদ্যমান সমস্যা এবং বিভিন্ন চাহিদার কথা বিস্তারিত লিখিতভাবে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। আশা করছি, এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচাতে দ্রুতই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর অষ্টগ্রামের পনির এখন শুধু কিশোরগঞ্জের নয়, পুরো বাংলাদেশের এক অনন্য গৌরব। তবে এই আন্তর্জাতিক সিলমোহর তখনই সার্থক হবে, যখন এই শিল্পের পেছনের মানুষগুলোর মুখে হাসি ফুটবে। এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে বর্ষাকালের জন্য বিকল্প পশুখাদ্যের (যেমন সাইলেজ বা উন্নত খড়) ব্যবস্থা, সরকারি উদ্যোগে আধুনিক হিমাগার স্থাপন, কারিগরদের জন্য জামানতবিহীন স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা এবং সরাসরি বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। সরকারি সুদূরপ্রসারী পৃষ্ঠপোষকতা আর আধুনিক উদ্যোগই পারে শত বছরের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
