

ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: পূজা অর্চনা, কীর্তন, আরাধনা, গঙ্গা স্নান ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে হাজারো জনসমাগমের মাধ্যমে উৎসবমুখর পরিবেশে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে ঐতিহ্যবাহী ঋষিঘাট গঙ্গা স্নান বারুণী মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (২৪ জুন) ভোর থেকে শুরু করে মেলাকে ঘিরে জেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্ত, দর্শনার্থী ও পূণ্যার্থী এখানে সমবেত হন। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহনকারী এ গঙ্গা স্নান বারুণী মেলা স্থানীয় জনগণের নিকট একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে পরিচিত। ভোর থেকেই পূণ্যার্থীদের ঢল নেমে ধর্মীয় বিশ্বাস মতে পবিত্র স্নানের মাধ্যমে পাপমুক্তি ও আত্মশুদ্ধির আশায় ভক্তরা গঙ্গা স্নানে অংশগ্রহণ করেন। স্নান শেষে তারা পূজা-অর্চনা, প্রার্থনা ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। ভক্তদের ধর্মীয় সংগীত, কীর্তন ও ভজন পরিবেশনের মধ্য দিয়ে পুরো এলাকা এক ভক্তিময় আবহে পরিণত হয়।
এ মেলাকে কেন্দ্র করে মেলা প্রাঙ্গণে আগের দিন থেকেই বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট, হস্তশিল্পের সামগ্রী, খেলনা, মিষ্টি ও খাবারের স্টল বসানো হয়। শিশু-কিশোরদের জন্য থাকে নানা ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা। ফলে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মেলাটি একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় রূপ নেয়। পরিবার-পরিজন নিয়ে আগত দর্শনার্থীরা মেলার পরের দিন পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটা সহ মেলার কার্যক্রম উপভোগ করেন।
মেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক দল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে। পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের খোঁজখবরের জন্য বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। ফলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই মেলা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে।
এ গঙ্গা স্নান বারুণী মেলা পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবানা তানজিন, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবদুল আল মামুন কাওসার শেখ, ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ মিয়া, ৩নং সিংড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসেন, উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মনোরঞ্জন মোহন্ত ভুট্টু প্রমুখ।
মেলা আয়োজক কমিটির নেতৃবৃন্দ জানান, এ গঙ্গা স্নান বারুণী মেলা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি এলাকার শতবর্ষী ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির প্রতীক। প্রতিবছর এ মেলায় বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে।
স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা বলেন, এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী মেলা দেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা ভবিষ্যতেও এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।
মেলা কমিটির সভাপতি অরুণ কুমার সরকার ও সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার সরকার বিধান জানান, উৎসবমুখর পরিবেশ, ব্যাপক জনসমাগম ও শান্তিপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে এ বছরের বারুনী গঙ্গা স্নান মেলা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মেলায় অংশগ্রহণকারী ভক্ত ও দর্শনার্থীরা আয়োজকদের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করে আগামী বছর আরও বৃহৎ পরিসরে এ মেলা আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
উপজেলা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি মনোরঞ্জন মোহন্ত ভুট্টু বলেন, গঙ্গা স্নান হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার। এই পবিত্র স্নানের মাধ্যমে ভক্তরা তাদের আত্মশুদ্ধি, কল্যাণ ও শান্তি কামনা করে থাকেন। একই সঙ্গে বারুণী মেলা আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। যুগ যুগ ধরে এই মেলা সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের বার্তা বহন করে আসছে।
