

ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যে যুদ্ধ বাধিয়েছেন, সেখান থেকে তিনি এখন বের হয়ে আসতে চাইছেন।
যুদ্ধের ইতি না ঘটলেও তিনি এরই মধ্যে বহুবার নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। কিছু দিন আগে ইরান যখন অল্প সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়েছিল, তখনও একবার যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য আটলান্টিক লিখেছে, চলমান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা ট্রাম্প বাড়িয়েই যাচ্ছেন। মাঝে নতুন করে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে ফলেনি।
চলতি সপ্তাহেও হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অভিযান ‘প্রোজেক্ট ফ্রিডম’ স্থগিত করে দেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প এই যুদ্ধ নিয়ে ‘বিরক্ত’ হয়ে পড়েছেন, কারণ এটি তার ধারণার চেয়েও অনেক বেশি জটিল রূপ নিয়েছে।
ট্রাম্পের দলের নেতারা দেখতে পাচ্ছেন, যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে এবং জনমত জরিপে রিপাবলিকানদের সমর্থন কমছে।
ফলে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে বেশি দিন পড়ে থাকতে চান না। তিনি চান না, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে তার চলতি সপ্তাহের চীন সফর ভেস্তে যাক।
অন্যদিকে ইরানের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, যুদ্ধ শেষ করা নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো তাড়া নেই। তারা মার্কিন মধ্যস্থতাকারীদের চাপিয়ে দেওয়া কোনো দাবি অন্তত মেনে নেবে না। ফলে ট্রাম্প একটা জটিল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছেন।
ইরানে হামলায় বিধ্বস্ত একটি আবাসিক ভবন স্থল। ছবি: রয়টার্সইরানে হামলায় বিধ্বস্ত একটি আবাসিক ভবন স্থল। ছবি: রয়টার্স
প্রেসিডেন্টের পাঁচজন সহযোগী ও বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা আটলান্টিককে বলেছেন, ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, যেকোনো ধরনের চুক্তি হলেই সেটাকে তিনি বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ‘দ্য আর্ট অব দ্য ডিল’ গ্রন্থের লেখক ট্রাম্প এখন ইরানকে আলোচনার টেবিলেও বসাতে পারছেন না।
সম্প্রতি ইরানকে ট্রাম্প প্রশাসন এক পাতার যে সমঝোতা স্মারক পাঠিয়েছে, ওয়াশিংটন এখন সে বিষয়ে তেহরানের জবাবের অপেক্ষায় আছে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের সামনে কঠিন একটা প্রশ্ন হাজির হয়েছে। সেটা হলো— প্রতিপক্ষ যদি একচুলও না নড়ে, তাহলে তিনি যুদ্ধ শেষ করবেন কীভাবে?
আর ট্রাম্প যখন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন, তখন তেহরানের শাসকরা যুদ্ধকে ব্যবহার করছেন নিজেদের ক্ষমতা আরো পোক্ত করতে।
ইরান এখন সেটাই করতে চাইছে, যা তারা আগেও করে দেখিয়েছে— একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অপদস্থ করা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, ট্রাম্প কখনো ভাবেননি।
ভেনেজুয়েলা থেকে নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে আসার পর ইরানের দিকে নজর দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের দুজন উপদেষ্টার বরাতে আটলান্টিক লিখেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার ঘনিষ্ঠদের বলেছিলেন, “ইরানও আরেকটি ভেনেজুয়েলা হবে।”
ট্রাম্পের ভেতরে বিশ্বাস জন্মেছিল, মার্কিন সামরিক শক্তির সামনে তেহরান দাঁড়াতে পারবে না। তেহরানের ধর্মীয় শাসন উৎখাতের আত্মবিশ্বাসও ছিল তার মধ্যে, যে লক্ষ্য তার কোনো পূর্বসূরি অর্জন করতে পারেননি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলা শুরু করে। এতে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের। নিহতের তালিকায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও আছেন।
এদিকে পাল্টা হামলায় ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে নিশানা বানিয়েছে ইরান।
জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় এক ডজন দেশে হামলা চালিয়েছে তারা।
এ যুদ্ধে প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি স্থবির হয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিমান পরিবহন ব্যবস্থা; হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে জ্বালানি পণ্যের বৈশ্বিক বাজারে।
তেহরানে রাস্তার পাশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হরমুজ প্রণালির প্রতীকি ছবিতে যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী একটি বিলবোর্ড। ছবি: রয়টার্সতেহরানে রাস্তার পাশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হরমুজ প্রণালির প্রতীকি ছবিতে যুক্তরাষ্ট্র-বিরোধী একটি বিলবোর্ড। ছবি: রয়টার্স
যুদ্ধের ৪০ দিনের মাথায় গত ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় দুই দেশ। এর তিন দিন পর ৪৭ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সরাসরি আলোচনায় বসে তেহরান ও ওয়াশিংটন।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদের পাঁচ তারকা হোটেলে সেই আলোচনা শুরু হয় ১১ এপ্রিল সন্ধ্যায়। দফায় দফায় বৈঠকের মধ্যদিয়ে পরের দিন সকালে গড়ানো সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শেষ হয় কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই।
এর মধ্যে গেল মঙ্গলবার দুই সপ্তাহ শেষ হওয়ার ঘণ্টা কয়েক আগে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প।
কিন্তু যুদ্ধবিরতির মধ্যেই হরমুজ প্রণালি ঘিরে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবরোধ ও অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, হরমুজে ট্রাম্প যে অবরোধ আরোপ করেছেন, তা কয়েক সপ্তাহ নয়, বরং কয়েক মাস সহ্য করতে পারবে ইরান।
গেল সপ্তাহে নীতিনির্ধারকদের কাছে দেওয়া একটি মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, ইরান অন্তত তিন থেকে চার মাস টিকে থাকতে পারবে।
যদি তাই হয় এবং ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধই রাখে, তাহলে পশ্চিমা বিশ্বে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম আরো বাড়বে। তখন লড়াইটা হবে দুই পক্ষের সহ্যশক্তি নিয়ে। কিন্তু ধৈর্য কিংবা সহনশীলতা ট্রাম্পের শক্তি নয়।
তার এক উপদেষ্টার ভাষ্য, ট্রাম্প তার কাছে বলেছেন যে তিনি যুদ্ধ নিয়ে ‘বিরক্ত’।

