

সচিবালয়ে ২১ তলা বিশিষ্ট আধুনিক ভবন নির্মাণের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়নি। এখন শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের কথা ভাবা হচ্ছে। চলছে নতুন নকশার কাজ। এতে গুরুত্ব পাচ্ছে যানজট ব্যবস্থাপনা।
সূত্র জানায়, জাতীয় সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকায় সচিবালয় চান সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। যুক্তরাষ্ট্রের স্থপতি লুই আই কানের নকশা অনুযায়ী এটা চান তারা।
পুরাতন পল্টনের আব্দুল গণি সড়ক থেকে শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তর করলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কোনো সমস্যা হবে কি না তা খতিয়ে দেখছে সরকার। এসব বিষয় মাথায় রেখে স্থাপত্য অধিদপ্তর নকশার কাজ চলমান রেখেছে। সচিবালয় স্থানান্তরে যানজট ব্যবস্থাপনা ঘিরে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
পাস হয়নি ২১ তলা ভবন প্রকল্প
২১ তলাবিশিষ্ট আধুনিক ভবন নির্মাণের প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদন পায়নি। প্রায় ৬৪৯ কোটি ২৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হলেও তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপদস্থরা যে মত দেন
গত ২৬ এপ্রিল সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রকল্পটি উত্থাপন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমান। প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদ ও সচিবালয় পাশাপাশি রাখার বিষয়ে মতামত দেন।
প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে, সুতরাং আমরা এটা মাথায় নিয়ে কাজ করছি। নকশার কাজ চলছে। আমরা শেরেবাংলা নগরের সাবেক বাণিজ্যমেলার খেলার মাঠও পরিদর্শন করেছি। মন্ত্রী-সচিব স্যার এগুলো অনুমোদন করবেন। কাজ চলমান। তবে নকশার কাজ চূড়ান্ত হয়নি।-স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি মো. আসিফুর রহমান ভূঁইয়া
সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তর করা হলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কেমন হবে- এটা ক্ষতিয়ে দেখতে বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বর্তমানে আগারগাঁও-শেরেবাংলা নগরে বেশকিছু সরকারি অফিস রয়েছে। নতুন করে সচিবালয় নির্মাণ করলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হবে কি না বিষয়টি দেখতে বলা হয়েছে।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের স্থপতি লুই আই কান প্রণীত নকশা অনুযায়ী ঢাকার শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
চলছে নতুন নকশার কাজ
স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি মো. আসিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে, সুতরাং আমরা এটা মাথায় নিয়ে কাজ করছি।’
শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে নকশার কাজ চলছে জানিয়ে বলেন, ‘তবে এটা শেষ হয়নি। আমরা শেরেবাংলা নগরের সাবেক বাণিজ্যমেলার খেলার মাঠও পরিদর্শন করেছি। মন্ত্রী-সচিব স্যার এগুলো অনুমোদন করবেন। কাজ চলমান। তবে নকশার কাজ চূড়ান্ত হয়নি।’
শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ সার্বিক বিষয়ে যাচাই করে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বিভিন্ন কারণে বর্তমানে তোপখানা রোড ও আব্দুল গণি রোডের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত বর্তমান সচিবালয়ের অভ্যন্তরে নতুন কোনো ভবন নির্মাণ না করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একনেক সভায় উপস্থিত থাকা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সচিবালয়ে ভবন অনেক বেশি হয়ে গেছে। পুরাতন হয়ে গেছে অনেক ভবন। তাই সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের স্থপতি লুই আই কান প্রণীত নকশা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন জানিয়ে বলেন, ‘পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিষয়টি দেখছেন। এছাড়া স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সচিবালয় ও সংসদ পাশাপাশি রাখার বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।’
১১ বছর ধরে আলোচনায় সচিবালয় স্থানান্তর
১১ বছর আগে আলোচনায় আসে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মাঠে স্থানান্তর হচ্ছে দেশের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়। নতুন সচিবালয় নির্মাণ প্রকল্প ২০১৫ সালের ১২ অক্টোবর একনেক বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। সে সময় প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ২০৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে এর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে প্রকল্পের ব্যয় মেটানোরও পরিকল্পনা করে। তবে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনের কাছাকাছি হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি, যানজটের আশঙ্কা ও অর্থায়ন সংকটসহ কয়েকটি কারণে এতদিন এ প্রকল্প একনেকে ওঠেনি।
সচিবালয় স্থানান্তরে স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকে কাজ হচ্ছে। তবে নকশা পাইনি। কথা শুনছি সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে। তবে আমরা লিখিত কোনো প্রস্তাব পাইনি।-গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রকল্প বিভাগ-২) আব্দুল্লাহ মুহম্মদ জুবাইর
কয়েক বছর পরে ফের প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপন করা হলেও অনুমোদন হয়নি। স্থাপতি লুই আই কানের নকশা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নে মত দিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। এর পরে অজানা কারণে আর আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রায় ৩২ একর জমি চারটি ব্লকে ভাগ করে সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মিত হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে দুটি বড় ব্লকে থাকবে ৩২টি বড় মন্ত্রণালয়। অবশিষ্ট দুটি ছোট ব্লকে ১৬টি ছোট মন্ত্রণালয়ের জন্য ভবন থাকবে। এর বাইরে অডিটোরিয়াম, সম্মেলন কেন্দ্র, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, ৯৪৬টি কার পার্কিংসহ ক্যাফেটেরিয়া ছিল নকশায়।
ওই সময় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকেও সচিবালয় স্থানান্তরে আপত্তি জানানো হয়। প্রকল্পটির পিইসি সভায় সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, বর্তমান সচিবালয়ের আশপাশে ট্রাফিক ব্যবস্থা সুগম করা কষ্টসাধ্য। তবে শেরেবাংলা নগরের প্রস্তাবিত স্থানের আশপাশে অনেক রাস্তা না থাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন। এছাড়া গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে ৫ আগস্টের পরে গণভবনে আর কোনো প্রধানমন্ত্রী থাকছেন না। এটা এখন জাদুঘর। সুতরাং, নতুন করে শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তর প্রকল্পটি আলোচনায় এসেছে।
যা ছিল ২১ তলা ভবন প্রকল্পে
সচিবালয়ে ২১ তলার আধুনিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি দ্বিতীয় দফায়ও পাসে আগ্রহ দেখায়নি একনেক সভা। মূলত পল্টন থেকে আগারগাঁও এলাকায় সচিবালয় স্থানান্তরে আগ্রহ দেখানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত এ প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৪৯ কোটি ২৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সচিবালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর প্রাণকেন্দ্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। এছাড়া সচিবালয় প্রাঙ্গণে অধিকসংখ্যক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের স্থান সংকুলান, জমির সুষ্ঠু ব্যবহার ও সরকারি অর্থের যথাযথ উপযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের আওতায় ২১ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এতে চারটি বেজমেন্টসহ একটি আধুনিক ফাউন্ডেশন ও সুপার স্ট্রাকচার অন্তর্ভুক্ত ছিল। অবকাঠামোটির মধ্যে অভ্যন্তরীণ পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, আধুনিক বিদ্যুতায়ন, গ্যাস সংযোগ ও ভূগর্ভস্থ জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
ভবনটিতে দুটি সাব-স্টেশন, জেনারেটর ব্যবস্থা ও উন্নত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপনের কথা ছিল। একই সঙ্গে যাতায়াতের সুবিধার্থে ছয় সেট প্যাসেঞ্জার লিফট, ছয় সেট ফায়ার লিফট ও দুই সেট বেড লিফট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। নিরাপত্তা ও কাজের পরিবেশ উন্নত করতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, আধুনিক কনফারেন্স সিস্টেম ও ২০টি সুসজ্জিত কনফারেন্স রুম নির্মাণের প্রস্তাবও ছিল প্রকল্পটিতে।
পরিকল্পনা বিভাগ তাদের পর্যালোচনায় উল্লেখ করে, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র হিসেবে সচিবালয়ে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, বিদেশি প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী ও সাধারণ মানুষের সমাগম ঘটে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সচিবালয়ে অতিরিক্ত দুই লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৬ বর্গফুট জায়গা তৈরি হতো, যা বর্তমান চাহিদার ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হতো।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (প্রকল্প বিভাগ-২) আব্দুল্লাহ মুহম্মদ জুবাইর বলেন, ‘সচিবালয় স্থানান্তরে স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকে কাজ হচ্ছে। তবে নকশা পাইনি। কথা শুনছি সচিবালয় স্থানান্তরের বিষয়ে। তবে আমরা লিখিত কোনো প্রস্তাব পাইনি।’
তিনি বলেন, ‘সচিবালয়ের ২১ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি একনেক বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। শেরেবাংলা নগরে নতুন সচিবালয় নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’
সুত্র: জাগো নিউজ

