

এম এ জলিল সরকার, পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দেশের একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান পার্বতীপুরে অবস্থিত বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা ও খোলাবাজারে কয়লা বিক্রির দাবিতে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়ন সংবাদ সম্মেলন করেছে। আজ সোমবার (২২ ডিসেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়ন।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি আবুল কাসেম শিকদার ও সাধারণ সম্পাদক জাঙ্গাঙ্গীর আলম বলেন, দেশের একমাত্র লাভজনক প্রতিষ্ঠান বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি বর্তমানে ধ্বংসের মুখে পড়ার আশঙ্কা। ২০০৫ সাল হতে বাণিজ্যিকভাবে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি হতে কয়লা উত্তোলন শুরু হয়। উত্তোলন শুরু হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত খনিটি সাফল্যের সাথে পরিচালিত হয়ে আসছে। বিগত কয়েক বছর অর্থাৎ ২০১১-১২, ২০১৩-১৪ এবং ২০১৬-১৭ করবছরে জাতীয় পর্যায় করদাতা হিসেবে পুরস্কারপ্রাপ্ত হয়েছে। যা কয়লা খনির জন্য একটি বড় অর্জন। সরকারি রাজস্ব আয়ের একটি বড় উৎস হিসেবে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০০৫ সাল হতে এ পর্যন্ত ভ্যাট, ট্যাক্স, রয়্যালটি, কাস্টম ডিউটি ও অন্যান্য রাজস্ব বাবদ প্রায় ৫শ’ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করেছে।
দেশের উত্তরাঞ্চলে সরকারি রাজস্ব আয়ের একমাত্র প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান যখন লোকসানের সম্মুখীন, তখন আমাদের এই গর্বের খনি শুরু থেকেই লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে দেশের মাটিতে। অতীতে কয়লা স্থানীয় ইটভাটা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হলেও মন্ত্রণালয়ের একক সিদ্ধান্তে বর্তমানে কেবল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়। কিছু দীর্ঘদিন ধরে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় কয়লা ব্যবহৃত হচ্ছে না। কোল ইয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতা ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টনের বিপরীতে বর্তমানে ৫ লাখ মেট্রিক টন কয়লা স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কোল ইয়ার্ডের কয়লা মজুদ নিরাপদ মজুদ উচ্চতার চেয়ে অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবে কয়লার মজুদ ৫-৭ ফুট উচ্চতায় রাখা হয়। বর্তমানে প্রায় ৫০ ফুটের বেশি উচ্চতায় কয়লা জমে রাখার ফলে পাহাড় ধ্বসের মতো ধসে পড়েছে। বাউন্ডারি ওয়াল ভেঙে হাইওয়ে সড়ক বন্ধ হওযার উপক্রম করেছে।
এদিকে, পিডিবি কয়লা ব্যবহার করতে পারছে না। ডমিস্টিক ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল এ ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তাদের কাছে কয়লা বিক্রির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। বড়পুকুরিয়ার কয়লা খনির উৎপাদন ব্যয় প্রতি টন ১৭৬ ডলার অথচ পিডিবি কয়লা খনিকে ৯১-১০৭ ডলার করে মূল্য পরিশোধ করায় কয়লা খনি বিপুল লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ থাকার দুর্বলতা আড়াল করতেই খনি বন্ধের প্রক্রিয়া জোরদার করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ বিভাগ ও পিডিবি'র কর্মকর্তারা কয়লা খনির পরিচালনা পর্ষদের পদ বাগিয়ে নিয়ে ক্রেতা হয়ে বেআইনিভাবে কয়লার মূল্য নির্ধারণে বিক্রেতার ভূমিকা পালন করছে। অর্থাৎ ক্রেতা তার ক্রয়কৃত মালামালের মূল্য নিজেই নির্ধারণ করছে। এই কয়লার খোলা বাজার মূল্য যেখানে ২০০ ডলারের উপরে সেখানে গ্রাহকের স্বার্থ বিবেচনা করে অযৌক্তিকভাবে প্রতি টন কয়লার মূল্য ১৭৬ ডলার থেকে হ্রাস করে ৯১-১০৭ ডলারে বিল প্রদান করছে। এমনটি হলে, কয়লা খনিটি আর লাভজনক থাকতে পারবে না এবং লোকসানের অজুহাতে এটিকে বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে খনিটির সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ২০-২৫ হাজার পরিবার তাদের জীবিকা হারানোসহ আর্থিকভাবে সংকটে পড়বে।
এসময় সংবাদ সম্মেলনে জরুরী ৭ দফা দাবি তুলে ধরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিকে লাভজনক ও সচল রাখতে এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে ১) পিডিবিতে ৯১-১০৭ ডলারে কয়লা বিক্রয়ের পরিবর্তে লোকাল মার্কেটে ২০০ ডলারের বেশি দামে বিক্রয় সম্ভব। তাই বড়পুকুরিয়ার কয়লা লোকাল মার্কেটে বিক্রয় করা হোক। ২) লোকাল মার্কেটে কয়লা বিক্রয় মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পিডিবির কয়লার মূল্যে নির্ধারণ করতে হবে। ৩) বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির বোর্ড বিদ্যুতের লোক দিয়ে চালানো যাবে না। ৪) অযৌক্তিক ভাবে কয়লার দাম কমিয়ে খনি বন্ধের চক্রান্ত বন্ধ হোক। ৫) খনি আমাদের রুটি-রুজি, তাই কয়লার দাম নির্ধারণে আমাদেরও মতামত নিতে হবে। ৬) নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, এই খনি আদমজী পাট কলের মতো লস প্রজেক্ট হবে না। ৭) খনিতে কর্মরত শ্রমিকদের রেশন ও অন্যান্য প্রান্তিক সুবিধা বাড়াতে হবে।
বক্তারা বলেন, ইতোপূর্বে তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির খনি বন্ধের আন্দোলনের সময যখন প্রশাসন নীরব ছিল তখন খনি শ্রমিক ও এলাকাবাসীর প্রতিরোধ করে তা খনি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। আগামীতে আমরা পূর্বের মতোই সড়ক ও রেলপথ অবরোধসহ বৃহত্তর আন্দোলনের মাধ্যমে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিকে ধ্বংসের হাত হতে রক্ষা করতে বাধ্য হবো।
এসময় সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি রাহেনুল ইসলাম, সিনিয়র সভাপতি রবিউল ইসলাম, বড়পুকুরিয়া কুলি লোড-আনলোড কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি শওকত আলী প্রমুখ।
সার্বিক বিষয়ে কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবু তালেব ফারাজী এ প্রতিবেদককে জানান, কয়লা খনি ও তাপবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা চলছে, কয়লা ইয়ার্ডে পড়ে থাকা কয়লার মালিক পিডিবি, কয়লা অধিক পরিমানে জমে পড়ে আছে কোল-ইয়ার্ডে সেটাও কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১নং বন্ধ, ২নং কোন রকম চলছে, ৩নং ইউনিটে ওভার হোলিং কাজ চলছে।
