ঢাকা
১৪ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ১০:৪৬
logo
প্রকাশিত : জুলাই ২, ২০২৬

দুই পরাশক্তি পর্তুগাল ও ক্রোয়শিয়ার মহারণ

টরন্টোর বিএমও ফিল্ডের ঘাস জুড়েই এখন বিশ্বজয়ের এক অলিখিত মহাকাব্য মঞ্চস্থ হওয়ার অপেক্ষায়। একদিকে সোনালী ট্রফির প্রথম অধ অধরা স্বপ্ন বুকে নিয়ে এক রূপকথার নায়ক, অন্যদিকে বারবার বুক চিতিয়ে লড়ে যাওয়া এক অপরাজেয় যোদ্ধার দল। শুক্রবার ভোরে শেষ বত্রিশের এই মরণপণ লড়াইয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে পর্তুগাল ও ক্রোয়েশিয়া।

গ্রুপ পর্বের গল্পটা দুই দলের জন্যই ছিল এক বন্ধুর পথ। গ্রুপ কে-তে কলম্বিয়ার চেয়ে দুই পয়েন্ট পিছিয়ে রানার্সআপ হয়ে নকআউটে পা রেখেছে পর্তুগাল। অন্যদিকে গ্রুপ এল-এ পরাশক্তি ইংল্যান্ডের চেয়ে মাত্র এক পয়েন্টের ব্যবধানে দ্বিতীয় হয়ে শেষ বত্রিশ নিশ্চিত করেছে ক্রোয়েশিয়া। সহজ পথে হেঁটে আসার দিন শেষ, এবার শুরু আসল পরীক্ষা।

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে পঞ্চম স্থানে থাকা পর্তুগালের সামনে এই ম্যাচটি মোটেও সহজ কোনো সমীকরণ নয়। কারণ তাদের প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া রয়েছে ঠিক তার ছয় ধাপ নিচে, এগারো নম্বরে। গ্রুপ পর্বে যদি রবার্তো মার্তিনেজের দল আরও কিছুটা দাপট দেখাতে পারত, তবে নকআউটের পথটা হয়তো এতটা কাঁটাময় হতো না।

পর্তুগালের এবারের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হয়েছিল এক বুক হতাশা দিয়ে। প্রথম ম্যাচেই ডিআর কঙ্গোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে পয়েন্ট খোয়ায় তারা। পুরো ম্যাচে আক্রমণের সেই চেনা ধার উধাও ছিল। তাদের প্রত্যাশিত গোল যেখানে ছিল মাত্র ০.৬৫, সেখানে কঙ্গোর ছিল ০.৮৭। তবে মহাতারকারা তো সহজে দমে যান না। দ্বিতীয় ম্যাচেই রুদ্রমূর্তি ধারণ করে পর্তুগাল। উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তারা জানান দেয় নিজেদের শক্তির। সেই রাজকীয় জয়ে জোড়া গোল করে দলকে নেতৃত্ব দেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। কিন্তু শেষ গ্রুপ ম্যাচে কলম্বিয়ার বিপক্ষে আবারও খেই হারিয়ে গোলশূন্য ড্র করে তারা। সেদিন কলম্বিয়ার ২৪টি শটের বিপরীতে পর্তুগাল নিতে পেরেছিল মাত্র ১৩টি শট।

গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়ার খেসারত হিসেবে পর্তুগালের সামনে এখন এক অগ্নিপরীক্ষা। এই ম্যাচ জিতলে শেষ ষোলোতে তাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ ইউরো ২০২৪ চ্যাম্পিয়ন স্পেন। সেই বাধা টপকালে কোয়ার্টার ফাইনালে দেখা হতে পারে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র কিংবা বেলজিয়ামের সঙ্গে। আর সেমিফাইনালের মঞ্চে হয়তো অপেক্ষা করছে ফ্রান্স কিংবা মরক্কো।

তবে ইতিহাস পর্তুগিজদের ফিসফিসিয়ে আশার বাণী শোনাচ্ছে। ইউরো ২০১৬ সালের সেই সোনালী অধ্যায়ের কথা মনে আছে? সেবারও গ্রুপ পর্বটা মনের মতো হয়নি তাদের। কিন্তু নকআউটের প্রথম ম্যাচেই এই ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়েই তারা শুরু করেছিল ট্রফি জয়ের মহাকাব্য। তাছাড়া সাম্প্রতিক ফর্মও তাদের পক্ষে কথা বলছে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আয়ারল্যান্ডের কাছে হারের পর থেকে টানা আট ম্যাচ অপরাজিত মার্তিনেজের শিষ্যরা। পাঁচটি জয় আর তিনটি ড্রয়ের এই পথচলায় তারা গোল হজম করেছে মাত্র চারটি, আর মাঠ ছেড়েছে চারটি ক্লিন শিট নিয়ে।

কিন্তু প্রতিপক্ষের নাম যখন ক্রোয়েশিয়া, তখন কোনো গল্পই আগে থেকে লিখে রাখা যায় না। ২০১৮ সালের রানার্সআপ এবং ২০২২ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলটি বড় মঞ্চে সবসময়ই এক ভয়ঙ্কর নাম। যদিও এবার শুরুটা হয়েছিল বড় ধাক্কা খেয়ে। জ্লাতকো দালিচের দল প্রথম ম্যাচেই ইংল্যান্ডের কাছে ৪-২ গোলে বিধ্বস্ত হয়। তবে ক্রোয়াটদের ডিকশনারিতে 'হার মেনে নেওয়া' শব্দটা নেই। পরের ম্যাচেই পানামাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় তারা। আর শেষ ম্যাচে ঘানাকে ২-১ গোলে পরাজিত করে নিশ্চিত করে নকআউট। সেই ম্যাচের ৮৩ মিনিটে যখন নিকোলা ভ্লাসিচ জয়সূচক গোলটি করেন, তখন তার জাদুকরী অ্যাসিস্টটি ছিল লুকা মদ্রিচের। আর এই অ্যাসিস্টের মাধ্যমেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক অ্যাসিস্টদাতার রেকর্ড নিজের করে নেন এই কিংবদন্তি।

সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে শেষ ১৬ ম্যাচের ১১টিতেই জিতেছে ক্রোয়েশিয়া। তবে খটকা এক জায়গায়, এই সময়ে তাদের যে চারটি হার এসেছে, তার প্রতিটিই ছিল র‍্যাঙ্কিংয়ে তাদের চেয়ে ওপরে থাকা দলগুলোর বিপক্ষে। তাই পর্তুগালের বিরুদ্ধে তাদের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে ফুটবল পাড়ায় কিছুটা সংশয় তো রয়েই যায়। দুই দলের মুখোমুখি পরিসংখ্যানও ক্রোয়েশিয়ার পক্ষে কথা বলে না। আগের ১০ বারের দেখায় ৭ বারই শেষ হাসি হেসেছে পর্তুগাল।

প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে শেষ ছয় সাক্ষাতের পাঁচটিতেই হেরেছে ক্রোয়েশিয়া। তবে ২০২৪ সালের উয়েফা নেশনস লিগে দুই দলের শেষ লড়াইটি ১-১ গোলে ড্র হয়েছিল, যা ক্রোয়াটদের নতুন করে সাহস জোগাচ্ছে।

যুদ্ধের দামামা বাজার আগে দুই শিবিরেই চলছে শেষ মুহূর্তের চাল চালার প্রস্তুতি। কলম্বিয়ার বিপক্ষে লড়াইয়ের পর পর্তুগাল শিবিরে নতুন কোনো চোটের আঘাত নেই। তবে নকআউটের মঞ্চে মার্তিনেজ তার একাদশে কিছু মাস্টারস্ট্রোক দিতে পারেন। মাঝমাঠের দখল নিতে শুরুর একাদশে ফিরতে পারেন জোয়াও নেভেস।

আর আক্রমণের সেনাপতি হিসেবে যথারীতি থাকছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে আবারও পুরো বিশ্বের চোখ থাকবে তার ওপর। ইতোমধ্যে দুটি গোল করে টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম ফুটবলার হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম অমর করে নিয়েছেন তিনি। গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তার সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবেন নুনো মেন্দেস, রেনাতো ভেইগা, রুবেন দিয়াস ও জোয়াও ক্যানসেলো।মাঝমাঠে ভিতিনিয়া ও জোয়াও নেভেসের যুগলবন্দীর সামনে আক্রমণের পসরা সাজানোর দায়িত্বে থাকবেন ব্রুনো ফার্নান্দেস।

ওদিকে ক্রোয়েশিয়া শিবিরও ঘানা ম্যাচের পর চোটমুক্ত ও চনমনে। তবে রণকৌশলে পরিবর্তন আনছেন জ্লাতকো দালিচও। যশকো গভার্দিওল আবার বাঁ প্রান্তের ডিফেন্সে ফিরে আসতে পারেন, যার ফলে ইভান পেরিশিচ আরও এগিয়ে বাম উইংয়ে খেলার স্বাধীনতা পাবেন। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ থাকবে অভিজ্ঞ লুকা মদ্রিচ ও মাতেও কোভাচিচের পায়ে, আর তাদের যোগ্য সাঙ্গাত হিসেবে দারুণ ফর্মে থাকা পেতার সুচিচই থাকছেন এগিয়ে। আর শেষ মুহূর্তে ঘানার বুক চূর্ণ করা নিকোলা ভ্লাসিচও এবার শুরুর একাদশেই বুক চিতিয়ে নামার জন্য প্রস্তুত।

সব মিলিয়ে টরন্টোর মাঠ এখন এক মহাকাব্যিক নাটকের মঞ্চ। একদিকে রোনালদোর শেষ বিশ্বকাপ রাঙানোর জেদ, অন্যদিকে মদ্রিচের শেষ জাদুতে ক্রোয়েশিয়ার রূপকথা গড়ার স্বপ্ন। কার গল্পে মিলবে নতুন অধ্যায়, আর কার গল্প থমকে যাবে শেষ বত্রিশেই, তার উত্তর মিলবে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram