

একই শ্রেণিতে পড়ে শহর ও গ্রামের দুই শিশু। একজন পড়া বুঝতে, ইংরেজি শিখতে কিংবা গণিতের জটিল সমস্যা সমাধান করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তা নিচ্ছে।
কোনো বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে মুহূর্তেই প্রশ্ন করছে এআই টুলকে। অন্যদিকে একই বয়সী আরেক শিশুর কাছে এই প্রযুক্তি এখনো অচেনা। শুধু শিশুটি নয়, তার অভিভাবকের কাছেও এআই অপরিচিত।
শিক্ষা ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই শিক্ষার্থীদের কঠিন বিষয় সহজে বুঝতে এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী শেখার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এর সুফল পেতে প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি সঠিক ব্যবহারের দক্ষতাও নিশ্চিত করতে হবে। এআই যখন শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত শেখার সহকারী হয়ে উঠছে, তখন সব শিশু সেই সুযোগ পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তি কি সবার শেখার সুযোগ বাড়াচ্ছে, নাকি বিদ্যমান বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন এক দেয়াল?
এসব প্রসঙ্গে সরকারি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির জন্য প্রস্তুত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের বৈষম্য কমবে বলে তাঁদের প্রত্যাশা।
গ্রাম ও মফস্বল এলাকার শিশুদের শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে দেশে কোনো গবেষণা বা জরিপ হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় বাস্তব পরিস্থিতি জানতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মাঠ পর্যায়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে রাজধানীর বনশ্রী-রামপুরা এবং কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার চৌদ্দশত, বিন্নাটি ও সুলতানপুর গ্রামের শিক্ষার্থীদের নিয়ে এই জরিপ করা হয়। এতে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫০ জন এবং কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন স্কুলের ৫০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলা হয়। পাশাপাশি গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের ৫০ জন অভিভাবকের কাছেও এআই সম্পর্কে তাঁদের জানাশোনা জানতে চাওয়া হয়।
জরিপে দেখা গেছে, শহরের ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪০ জন, অর্থাৎ ৮০ শতাংশ, এআই সম্পর্কে জানে। গ্রামে এই হার মাত্র ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের ৭০ শতাংশেরই এআই সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। শহরে এ ধরনের শিক্ষার্থীর হার ২০ শতাংশ। এদিকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যবধান আরো বেশি। শহরের ৩০ জন শিক্ষার্থী, অর্থাৎ ৬০ শতাংশ, পড়াশোনার কাজে এআই ব্যবহার করেছে। তাদের মধ্যে ২০ জন নিয়মিত এআইয়ের সহায়তা নেয়। অন্যদিকে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে পড়াশোনার কাজে এআই ব্যবহার করেছে মাত্র তিনজন, যা মোট শিক্ষার্থীর ৬ শতাংশ। দুই এলাকার মধ্যে ব্যবহারের হারের ব্যবধান ৫৪ শতাংশ পয়েন্ট।
গ্রামে এআই সম্পর্কে কিছুটা জানে এমন ১৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০ জন শুধু নাম শুনেছে, কখনো ব্যবহার করেনি। বাকি পাঁচজন এআই ব্যবহার করেছে ব্যক্তিগত ছবি তৈরির কাজে। অর্থাৎ গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের এআইয়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে, তাদের কারো কারো ক্ষেত্রে সেই পরিচয় পড়াশোনার বদলে ছবি তৈরির মতো কাজে সীমিত রয়েছে। তবে একই শিক্ষার্থী একাধিক কাজে এআই ব্যবহার করে থাকতে পারে। তাই ছবি তৈরি ও পড়াশোনায় ব্যবহারের সংখ্যা যোগ করে মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যা নির্ধারণ করা যাবে না।
ব্যবধানটি শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, রয়েছে পরিবারের ভেতরেও। জরিপে অংশ নেওয়া গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের ৫০ অভিভাবকের মধ্যে ৪৫ জন জানিয়েছেন, তাঁরা এআইয়ের কথা কখনো শোনেননি। অর্থাৎ ৯০ শতাংশ অভিভাবকেরই এই প্রযুক্তি সম্পর্কে কোনো পরিচিতি নেই। জরিপের ফল বলছে, এআই সম্পর্কে পরিচিতি এবং পড়াশোনার কাজে এটি ব্যবহারের সুযোগের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে।
শহর-গ্রামে বড় ব্যবধান : বাংলাদেশে ইন্টারনেটের বিস্তার ঘটলেও এর ব্যবহার ও সুযোগের ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের ব্যবধান এখনো বড়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আইসিটি অ্যাকসেস অ্যান্ড ইউজ বাই হাউসহোল্ডস অ্যান্ড ইনডিভিজুয়ালস সার্ভে ২০২৪-২৫ অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে ৭৫.৭ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। গ্রামাঞ্চলে এই হার ৪৩.৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান ৩২.১ শতাংশ পয়েন্ট। জাতীয়ভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার ৫৩.৪ শতাংশ।
পরিবারে কী ধরনের ডিভাইস আছে, শিশু সেটি ব্যবহারের সুযোগ পায় কি না এবং সংযোগের খরচ বহনের সামর্থ্য রয়েছে কি না, তার ওপরও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নির্ভর করে। বিবিএসের একই জরিপ অনুযায়ী, দেশের মাত্র ৯.২ শতাংশ পরিবারের কম্পিউটার রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে মাত্র ৩.৮ শতাংশ মানুষের; শহরাঞ্চলে এই হার ২০.৭ শতাংশ।
অন্যদিকে দেশের ৭২.৭ শতাংশ পরিবারের স্মার্টফোন রয়েছে। তবে পরিবারের স্মার্টফোন থাকা মানেই শিশুটির নিজের ডিভাইস থাকা নয়। একই ফোন পরিবারের একাধিক সদস্য ব্যবহার করলে পড়াশোনার প্রয়োজনে শিশুর ব্যবহারের সুযোগ সীমিত হতে পারে। স্মার্টফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করা গেলেও ছোট পর্দায় দীর্ঘ লেখা পড়া কিংবা জটিল কাজ করা কম্পিউটারের তুলনায় কঠিন হতে পারে।
ডিভাইস আছে, সুযোগ নেই : কিশোরগঞ্জে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআই ব্যবহারের সুযোগের ব্যবধান বুঝতে মাঠ পর্যায়ে কথা বলে তিন ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। কারো পরিবারের স্মার্টফোন না থাকায় এআই ব্যবহারের সুযোগ নেই, কারো বাসায় ফোন থাকলেও অভিভাবকের বিধি-নিষেধে তা পড়াশোনায় কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার পরিবারের কাছ থেকে প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা পেয়ে কেউ কেউ এআই ব্যবহার করে পড়াশোনার বিষয় বুঝে নিচ্ছে।
ফাহিমের বাসায় স্মার্টফোন নেই। ফলে এআই ব্যবহার করে পড়াশোনার বিষয় বোঝা কিংবা নতুন কিছু শেখার সুযোগও তার তৈরি হয়নি। অন্যদিকে সুলতানপুর এলাকার একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী তানিশা আক্তারের বাসায় স্মার্টফোন থাকলেও পরিবারের আশঙ্কা, ফোন হাতে পেলে পড়াশোনার বদলে অন্য কাজে সময় কাটাবে সে। তানিশা বলে, ‘বাসায় স্মার্টফোন আছে, কিন্তু আমাকে খুব একটা ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। পরিবারের ধারণা, ফোন হাতে পেলে পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাবে। কখনো ফোন ব্যবহার করতে পারলেও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা বা ভিডিও দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকি। পড়াশোনায় এআই কিভাবে কাজে লাগানো যায়, তা শেখার সুযোগ হয়নি।’
পরিবারের সহায়তায় এআই ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে বিন্নাটি এলাকার একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাতুল হাসান। তার বাবা শিক্ষক হওয়ায় দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই এআই সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। কোনো বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে চ্যাটজিপিটির কাছে সহজ ব্যাখ্যা চায় রাতুল। বন্ধুদেরও দেখিয়ে দেয় কিভাবে এআইয়ের সহায়তায় পড়াশোনার বিষয় বোঝা যায়। রাতুল বলে, ‘বাবা শিক্ষক হওয়ায় এআই সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। কোনো বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে সেটি সহজভাবে বুঝিয়ে দিতে বলতে পারি। এখন বন্ধুদেরও দেখাই, কিভাবে এআই ব্যবহার করে পড়াশোনার বিষয়গুলো বুঝে নেওয়া যায়।’
শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিদ্যালয় পর্যায়েও এআই শেখার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের ঘাটতি রয়েছে। কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. এনামুল হক বলেন, স্কুল পর্যায়ে এখনো এআই বা চ্যাটজিপিটির মতো প্রযুক্তি শেখানোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে জাতীয় শিক্ষাক্রমের পাঠ্যবই ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসের মাধ্যমে পাঠদান চলছে। শ্রেণিকক্ষে এআই ব্যবহারের বিষয়ে সরকারের কোনো নির্দেশনা বা নীতিমালা পাওয়া যায়নি। ভবিষ্যতে সরকারি নির্দেশনা এলে বা সহশিক্ষা কার্যক্রমে এআই যুক্ত হলে শিক্ষার্থীদের শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহায়তা : রাজধানীর বনশ্রী এলাকার ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়ান বাসায় ল্যাপটপে এআই ব্যবহার করে। সে বলে, ‘বাসায় ল্যাপটপে এআই ব্যবহার করি। কোনো সমস্যা বা প্রশ্ন লিখলে সেটির সমাধান পাওয়া যায়। শুরুতে মা আমাকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন কিভাবে প্রশ্ন করতে হয়। এখন নিজেই অনেক কিছু করতে পারি।’
দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রিশাদ আহমেদের মতে, এআই পড়াশোনার জটিল বিষয় বুঝতে সাহায্য করছে। আগে কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে শিক্ষক বা বন্ধুর সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। এখন এআইকে ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দিতে বলা যায়। তবে এর উত্তরের সঠিকতা যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেয় সে। রিশাদ বলে, ‘পাওয়া উত্তর ঠিক কি না, সেটিও যাচাই করা দরকার।’
অভিভাবক সাবিনা আক্তার বলেন, শহরের শিশুরা পরিবারের সদস্যদের প্রযুক্তি ব্যবহার করতে দেখে অনেক কিছু শিখছে। তিনি নিজেও বিভিন্ন কাজে এআইয়ের সাহায্য নেন। তা দেখে তাঁর সন্তানরাও এআই ব্যবহার করে প্রশ্নের উত্তর ও সমস্যার সমাধান খুঁজতে আগ্রহী হচ্ছে। তবে শিশুরা প্রযুক্তি যথাযথভাবে ব্যবহার করছে কি না, সেদিকেও অভিভাবকদের নজর রাখা প্রয়োজন।
রাজধানীর লালমাটিয়ায় অবস্থিত একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল নিজেদের বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এআইভিত্তিক স্কুল হিসেবে দাবি করে। প্রতিষ্ঠানটিতে তৃতীয় শ্রেণি থেকেই কেমব্রিজ ও এডেক্সেল কারিকুলামের পাশাপাশি নিয়মিত ল্যাব কার্যক্রমে এআই কোডিং ও রোবটিকস শেখানো হয়। এর লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা, সমস্যা সমাধান ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো।
প্রতিষ্ঠানটির এক শিক্ষক বলেন, ‘শিশুদের ছোটবেলা থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), কোডিং ও রোবটিকসের সঙ্গে পরিচিত করা জরুরি। আমাদের এখানে তৃতীয় শ্রেণি থেকেই কেমব্রিজ ও এডেক্সেল কারিকুলামের পাশাপাশি নিয়মিত ল্যাব কার্যক্রমে এআই কোডিং ও রোবটিকস শেখানো হয়। এর উদ্দেশ্য শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা, সমস্যার সমাধান খোঁজা এবং নিজেরা নতুন কিছু তৈরি করতে উৎসাহিত করা।’
ইন্টারনেট বাড়লেও সুযোগে ঘাটতি : শিশুদের শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়লেও প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট ও ডিভাইসের সুযোগ সবার সমান নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশের ৩৭.৬ শতাংশ পরিবারের ঘরে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ ছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৭২.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে ৭ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫০.১ শতাংশের পড়ার প্রাথমিক দক্ষতা রয়েছে। গণিতে এই হার আরো কম, ৩৯.২ শতাংশ।
মিকস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৯৭ শতাংশ পরিবারের ফোন ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে কম্পিউটার রয়েছে মাত্র ৬.১ শতাংশ পরিবারের। ফলে অনেক শিশুর ডিজিটাল জগতে প্রবেশের প্রধান মাধ্যম মোবাইল ফোন। তবে ডিভাইস ভাগাভাগি করে ব্যবহার, ধীরগতির ইন্টারনেট কিংবা প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতার অভাবে এআইয়ের সুবিধা নেওয়া কঠিন হতে পারে।
করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনলাইন ও টেলিভিশনের মাধ্যমে দূরশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সব শিশু সেই সুযোগ পায়নি। বিবিএস ও ইউনিসেফের সার্ভে অন চিলড্রেনস এডুকেশন ইন বাংলাদেশ ২০২১ অনুযায়ী, স্কুল বন্ধ থাকার সময় দেশের মাত্র ১৮.৭ শতাংশ শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণে অংশ নিয়েছিল। শহরাঞ্চলে এই হার ছিল ২৮.৭ শতাংশ, গ্রামাঞ্চলে ১৫.৯ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক ডিভাইস ছিল এমন পরিবারের হারও শহরে বেশি ছিল। শহরে এই হার ৫০.৬ শতাংশ, গ্রামে ৩২.৯ শতাংশ।
এই প্রসঙ্গে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও বিটোপিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও গ্রুপ সিইও মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, এআইয়ের সুবিধা শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে শিক্ষায় বিদ্যমান বৈষম্য আরো বাড়তে পারে। তাই গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ ও প্রয়োজনীয় ডিভাইসের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
তাঁর মতে, শিক্ষায় প্রযুক্তির সাফল্য শুধু কতটি ডিভাইস বিতরণ করা হলো, তা দিয়ে বিচার করা যাবে না। শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে এবং প্রযুক্তি তাদের শেখার ক্ষেত্রে কতটা কাজে আসছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। এআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই করার দক্ষতা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা সম্পর্কেও শিক্ষার্থী, পরিবার ও শিক্ষকদের সচেতন করা প্রয়োজন।
পড়ালেখায় এআই কতটা কার্যকর : এআইভিত্তিক শিক্ষা টুলের সুবিধা নিয়ে আলোচনা বাড়লেও সব পরিস্থিতিতে এগুলো শেখার মান বাড়ায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছার মতো প্রমাণ এখনো সীমিত। ইউনেসকোর ২০২৩ সালের গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্টে বলা হয়, শিক্ষায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে নির্ভরযোগ্য গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার কোথায়, কিভাবে এবং কোন শিক্ষার্থীর জন্য হচ্ছে, তার ওপর ফলাফল নির্ভর করে। যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের আরো এগিয়ে দিতে পারে এবং পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের বৈষম্য বাড়াতে পারে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মনির হোসেনের মতে, এআই শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত শেখার সহায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তি এখন শুধু যোগাযোগ বা বিনোদনের মাধ্যম নয়, শেখার ধরনও বদলে দিচ্ছে। এআইয়ের সহায়তায় একজন শিক্ষার্থী কঠিন বিষয় সহজে বুঝতে পারে, নিজের প্রয়োজনমতো প্রশ্নের উত্তর পায়, যে বিষয়ে দুর্বল সেখানে বাড়তি সহায়তা নিতে পারে। শিক্ষক সব সময় পাশে না থাকলেও এআই শেখার সহায়ক হতে পারে।’
তবে এআইয়ের কাছ থেকে উত্তর পাওয়া আর বিষয়টি সত্যিকার অর্থে শেখা এক নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিক বলেন, কোনো বিষয় গভীরভাবে বোঝা কিংবা নতুন কিছু শেখার জন্য এআইয়ের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু নিজে চিন্তা না করে অ্যাসাইনমেন্টসহ সব কাজ এআই দিয়ে করিয়ে নেওয়া ঠিক নয়। এতে শিক্ষার্থীরা কাজ সম্পন্ন করলেও বিষয়টি যথাযথভাবে বুঝতে না পারার ঝুঁকি থাকে। তাঁর ভাষায়, দীর্ঘদিন হাঁটাচলা না করলে যেমন পায়ের পেশির সক্ষমতা কমে যায়, তেমনি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর এআইয়ের কাছ থেকে খুঁজতে থাকলে মানুষের চিন্তা করার দক্ষতাও দুর্বল হতে পারে।
চিন্তাশক্তি যেন না কমে : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিক বলেন, এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শিক্ষার্থীদের নিজে চিন্তা করার প্রবণতা কমিয়ে দিতে পারে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের জোড়ায় আলোচনা করতে বলার পরও কেউ কেউ নিজেরা চিন্তা না করে এআইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে বলে তিনি অভিজ্ঞতার কথা জানান।
তিনি বলেন, এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও শিক্ষার্থীদের চিন্তা, যুক্তি ও বিশ্লেষণ করার দক্ষতা বিকাশের সুযোগ থাকতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার, শিক্ষকদের দক্ষতা এবং পাঠ্যক্রমের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার উদ্যোগ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশিক্ষণ কিংবা ব্যয়ের হিসাব দেখলে হবে না; শিক্ষার্থীরা বাস্তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং এর ফলে তাদের শেখার মান বাড়ছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
এ জন্য শিক্ষার্থীদের ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ, ইন্টারনেটের গতি ও খরচ, বিদ্যুৎ সুবিধা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং এআই সম্পর্কে দক্ষতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে জরিপের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। এতে কোন অঞ্চলের বা কোন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে আছে, তা শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিনিয়োগ করা সম্ভব হবে।
সাব্বির আহমেদ চৌধুরী আরো বলেন, শিক্ষার্থীদের বয়স ও পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নির্ভরযোগ্য বাংলা শিক্ষা উপকরণ তৈরি করা প্রয়োজন। দুর্বল ইন্টারনেটেও ব্যবহার করা যায় এমন উপকরণ তৈরির পাশাপাশি এআইয়ের ভুল ও পক্ষপাত শনাক্ত করা, তথ্যের উৎস যাচাই এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে। এসব উদ্যোগের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট, সময়সীমা ও অগ্রগতি পরিমাপের সূচকও থাকা দরকার।
বৈষম্য কমাতে ১৮ হাজার কোটি টাকা : শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ১৭ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সাত লাখের বেশি শিক্ষকের জন্য ট্যাব, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, ইন্টার্যাক্টিভ প্যানেল ও উচ্চগতির ইন্টারনেটের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল পাঠ পরিকল্পনা, অনলাইন শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিক এডু আইডি চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
এ ছাড়া ৩২টি জেলায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপনে প্রায় চার হাজার ২০০ কোটি টাকার পরিকল্পনা রয়েছে। এক লাখ শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিতে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘লার্নিং অ্যাকসেলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ প্রকল্পের আওতায় তিন লাখ ৬০ হাজার ৫৬৬ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়েও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিতে (পিইডিপি-৫) প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। এতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির পাশাপাশি এক হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টার্যাক্টিভ ফ্ল্যাট প্যানেল স্থাপন এবং এআইভিত্তিক শিক্ষা সহায়তা ব্যবস্থার পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, এসব উদ্যোগ শিক্ষায় প্রযুক্তির সুযোগ বাড়াতে পারে। তবে শুধু ডিভাইস দিলেই হবে না; ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এসব সুবিধা কতটা পাচ্ছে, তার ওপরও ফলাফল নির্ভর করবে। প্রকল্পগুলোর অনুমোদন, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের ওপরও পরিকল্পনার কার্যকারিতা নির্ভরশীল।
প্রযুক্তির সুফল সবার জন্য : শিক্ষামন্ত্রী : শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা মানুষের কাছে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করার জন্য। এর সুফল যেন শুধু সচ্ছল শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বৈষম্য বাড়ানোর বদলে তা কমাতে সহায়তা করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানো, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ তৈরি, ইন্টারনেট ও ডিভাইসের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। তবে এসব সুবিধা গ্রাম ও পিছিয়ে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছেও পৌঁছানো জরুরি।
