

আজ ৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব রেডিওথেরাপি সচেতনতা দিবস। ইংরেজিতে দিনটির নাম ‘World Radiotherapy Awareness Day’। ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপির অপরিহার্য ভূমিকা সম্পর্কে সাধারণ মানুষ, নীতিনির্ধারক এবং স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সচেতন করাই এই বৈশ্বিক উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালিত হয়। ‘One Voice for Radiotherapy’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বিশ্বজুড়ে রেডিওথেরাপির পক্ষে একটি সম্মিলিত কণ্ঠ তৈরির চেষ্টা চলছে।
৭ সেপ্টেম্বর এই দিবস হওয়ার পেছনে রয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৫৩ সালের এই দিনে লন্ডনের হ্যামারস্মিথ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত বিশ্বের প্রথম ক্লিনিক্যাল লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর বা লিনাক দিয়ে এক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। উচ্চশক্তির এক্স-রে ব্যবহার করে টিউমার ধ্বংসের সেই উদ্যোগ আধুনিক রেডিওথেরাপির নতুন যুগের সূচনা করেছিল। সেই স্মরণীয় ঘটনাকে সম্মান জানাতেই ৭ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব রেডিওথেরাপি সচেতনতা দিবস হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
ক্যানসারের চিকিৎসা সাধারণত সার্জারি, ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা এবং রেডিওথেরাপি, এই তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের চিকিৎসার কোনো না কোনো পর্যায়ে রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়। এটি শুধু রোগ নিরাময়ের জন্য নয়, ব্যথা, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট কিংবা হাড় ও মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়া ক্যানসারের উপসর্গ দ্রুত কমাতেও অত্যন্ত কার্যকর।
তবু রেডিওথেরাপি নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। কেউ মনে করেন, এটি শুধু রোগের শেষ পর্যায়ে দেওয়া হয়। অনেকে আবার অতিরিক্ত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা শরীরে ‘রেডিয়েশন থেকে যাওয়ার’ ভয়ে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। বাস্তবে অধিকাংশ এক্সটার্নাল বিম রেডিওথেরাপির পর রোগীর শরীর তেজস্ক্রিয় হয়ে যায় না এবং তিনি পরিবারের সদস্যদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নন। আধুনিক লিনাক, ত্রিমাত্রিক বা 3D CRT পরিকল্পনা, IMRT, VMAT, ইমেজ গাইডেড রেডিওথেরাপি ও স্টেরিওট্যাকটিক প্রযুক্তির মাধ্যমে টিউমারে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে রশ্মি দেওয়া যায়। পাশাপাশি আশপাশের সুস্থ অঙ্গগুলোকে যথাসম্ভব সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য দিবসটির তাৎপর্য আরও গভীর। আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে প্রায় এক লাখ ৮৭ হাজার মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রায় এক লাখ ৩৯ হাজার মানুষ ক্যানসারে মারা গেছেন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, তামাক ব্যবহার এবং পরিবেশ ও জীবনযাপনের পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
এই বিপুল চাহিদার তুলনায় দেশে রেডিওথেরাপির সুযোগ এখনো সীমিত। অধিকাংশ আধুনিক কেন্দ্র ঢাকা ও কয়েকটি বড় শহরকেন্দ্রিক। ফলে দিনাজপুর, বরিশাল, রংপুর, খুলনা কিংবা দূরবর্তী কোনো জেলা থেকে এক রোগীকে চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। যাতায়াত, বাসস্থান, কর্মহানি এবং পরিবারের খরচ যোগ হয়ে অনেকের পক্ষে চিকিৎসা শুরু বা সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। মনে রাখতে হবে, একটি রেডিওথেরাপি মেশিন কেনা এবং সেটিকে বছরের পর বছর কার্যকর রাখা এক বিষয় নয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিক্যাল ফিজিসিস্ট, রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট, নার্স, ডোজিমেট্রিস্ট, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও মাননিয়ন্ত্রণ ছাড়া নিরাপদ চিকিৎসা সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেল গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে। সরকার জমি, অবকাঠামো, নীতিগত সহায়তা, করসুবিধা বা দিতে পারে। বেসরকারি অংশীদার প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে পারে। তবে এমন অংশীদারত্বে চিকিৎসার মূল্য, দরিদ্র রোগীর জন্য নির্ধারিত কোটা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে। শুধু মেশিন স্থাপন নয়, সেটি যেন নিয়মিত সচল থাকে এবং সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে চিকিৎসা পায়, সেটিই হওয়া উচিত পিপিপির সাফল্যের মূল সূচক।
দেশের বিভিন্ন জেলার শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও সমাজের বিত্তবান মানুষও এই উদ্যোগে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখতে পারেন। নিজ জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার সেন্টার প্রতিষ্ঠা, রেডিওথেরাপি মেশিন ক্রয়, রোগীর আবাসন কিংবা দরিদ্র রোগীদের জন্য চিকিৎসা তহবিল গঠন হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী মানবিক অবদান। একজন মানুষের পক্ষে পুরো কেন্দ্র নির্মাণ সম্ভব না হলেও অনেকে মিলে ট্রাস্ট বা ফাউন্ডেশন গঠন করে এই কাজ এগিয়ে নিতে পারেন। ছোট-বড় সব অনুদান একটি স্বচ্ছ তহবিলে যুক্ত হলে তা একদিন একটি কার্যকর ক্যানসার সেন্টারে রূপ নিতে পারে। একটি রেডিওথেরাপি মেশিন তার কর্মজীবনে হাজার হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিতে পারে। তাই এ ধরনের বিনিয়োগ শুধু একটি ভবন নির্মাণ নয়, এটি বহু পরিবারের জন্য বেঁচে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করা।
একই সঙ্গে Evidence based স্বল্পমেয়াদি রেডিওথেরাপি বা হাইপোফ্র্যাকশনেশন উপযুক্ত রোগীদের জন্য আরও ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে যেখানে আগে পাঁচ থেকে সাত সপ্তাহ চিকিৎসা লাগত, এখন নিরাপদভাবে এক থেকে চার সপ্তাহে চিকিৎসা সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে রোগীর যাতায়াত ও আর্থিক চাপ কমে এবং একই মেশিনে অধিক রোগীকে সেবা দেওয়া যায়। তবে সংক্ষিপ্ত চিকিৎসা মানেই সবার জন্য একই ব্যবস্থাপত্র নয়; রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত অপরিহার্য।
রেডিওথেরাপি কোনো বিলাসবহুল প্রযুক্তি নয়; এটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসার একটি মৌলিক অংশ। এক রোগী কোথায় জন্মেছেন, কোথায় বসবাস করেন কিংবা তার আর্থিক সামর্থ্য কতটুকু, এসব কোনো কিছুই যেন তার জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নির্ধারণ না করে। এ জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট জাতীয় পরিকল্পনা, রেডিওথেরাপি সেবার বিকেন্দ্রীকরণ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, বিত্তবান ও প্রবাসীদের সামাজিক বিনিয়োগ এবং দরিদ্র রোগীদের জন্য কার্যকর আর্থিক সহায়তা। একটি রেডিওথেরাপি কেন্দ্র শুধু একটি ভবন বা কয়েকটি যন্ত্রের সমষ্টি নয়; এটি একজন মায়ের সন্তানদের কাছে ফিরে যাওয়ার আশা, একজন বাবার পরিবারের পাশে আরও কিছুদিন থাকার সুযোগ এবং অসংখ্য মানুষের ব্যথামুক্ত জীবনের সম্ভাবনা।
আজ বিশ্ব রেডিওথেরাপি সচেতনতা দিবসে আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার হোক, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন রোগীকেও যেন শুধু দূরত্ব, অর্থের অভাব বা চিকিৎসাকেন্দ্রের সংকটের কারণে বেঁচে থাকার ন্যায্য সুযোগ হারাতে না হয়। কারণ সময়মতো রেডিওথেরাপি পাওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি প্রতিটি ক্যানসার রোগীর ন্যায্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার।
ডা. আরমান রেজা চৌধুরী
ক্যানসার বিশেষজ্ঞ
এভারকেয়ার হাসপাতাল ঢাকা
