ঢাকা
৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বিকাল ৩:৪০
logo
প্রকাশিত : মার্চ ৭, ২০২৬

মনুষ্যত্ব রক্ষা করা এখন সর্বব্যাপী এক চ্যালেঞ্জ

কবি নজরুল ইসলামের সমাজ বিপ্লবকামী কালজয়ী প্রতিভা যে অল্প সময়ের মধ্যেই স্তব্ধ হয়ে গেল তার পেছনে পারিবারিক আর্থিক সংকট, পুত্র হারানোর শোক, স্ত্রীর অসুস্থতার বেদনা যেমন ছিল, তেমনি কিন্তু কাজ করেছে, যে আন্দোলনের ওপর তিনি ভরসা করেছিলেন, তার প্রবাহ স্তিমিত হয়ে যাওয়া। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো কবি এবং সমরেশ বসুর মতো কথাসাহিত্যিকের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও কর্মী হয়ে যাওয়া এবং পরে দল ত্যাগ করার জন্যও কেবল তাঁদের ব্যক্তিগতভাবে দুষলে চলবে না, আন্দোলনের অনগ্রসরতার বিষয়টিকেও বিবেচনায় নিতে হবে। সমাজ বিপ্লবের প্রতিহত দশা অবশ্য কেবল যে এ দেশে সত্য ছিল তা-ও নয়, ঘটেছে বিশ্বব্যাপী।

সলিল চৌধুরীর মতো অসামান্য গীতিকার ও সুরকারও প্রাণবন্ত হয়েছিলেন কমিউনিস্টদের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েই।

তিনিও ছিলেন বিপ্লবে বিশ্বাসী। তাঁর বাবা ছিলেন আসামের চা-বাগানের চিকিৎসক। বাবার কাছেই সংগীত শিক্ষায় হাতেখড়ি। বাবা কেবল গান গাইতেন না, চা-শ্রমিকদের সঙ্গে মঞ্চে অভিনয়ও করেছেন।

কলকাতায় এসেছিলেন পড়ালেখা করতে। চা-বাগানের মাঠের ঘন সবুজ বিস্তার এবং ওপরের উদার নীল আকাশকে সঙ্গে নিয়েই এসেছিলেন, কিন্তু তিনি সলিল চৌধুরী হতেন না, অন্য কেউ হতেন, যদি না ১৯৪৪-এ যুক্ত হতেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে। সংগঠনটির আন্তরিক সংযোগ ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। সলিল চৌধুরীর লেখা ও সুর দেওয়া গান, ‘কোন এক গাঁয়ের বধূর কথা’ পঞ্চাশের মন্বন্তরের অবিস্মরণীয় ছবি হয়ে আজও বেঁচে আছে এবং থাকবে।

ওই গান যেন শিল্পী জয়নুল আবেদিনের সাদাকালোতে আঁকা দুর্ভিক্ষ ও পীড়িত মানুষগুলোর ছবির পরিপূরক। সলিল চৌধুরীর ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’ এবং ‘ও আলোর পথযাত্রী’ মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতারে নিয়মিত গাওয়া হয়েছে এবং মানুষকে উদ্দীপ্ত করেছে। গণসংগীত হিসেবে গান দুটি দীর্ঘ জীবন লাভ করেছে।

মনুষ্যত্ব রক্ষা করা এখন সর্বব্যাপী এক চ্যালেঞ্জভালো কথা, গণসংগীতকে যে আমরা গণসংগীত বলি, সেটি শুধু এই কারণে নয় যে ওই গান সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হয়; আসল কারণ গণসংগীতে জনমুক্তির সংগ্রামের কথা ও আবেগ উপস্থিত থাকে। সলিল চৌধুরীর হাতে সুকান্তের ‘ঠিকানা’, ‘অবাক পৃথিবী’ ও ‘রানার’ কবিতার যে সুরারোপ, সে তো শুনলে ভুলবার নয়; হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের দরাজ কণ্ঠস্বর ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের সংগীতময়তা তো মনে হয় সলিল চৌধুরীর সুরের জন্য অপেক্ষা করছিল।

লতা মুঙ্গেশকর বাঙালি গায়িকা হয়ে গিয়েছিলেন সলিল চৌধুরীর সুর দেওয়া কথায় কণ্ঠ দিয়ে। সলিল চৌধুরী চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক হিসেবেও অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছেন। তবে সংস্কৃতির ইতিহাসে তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন সমাজ বিপ্লবের পক্ষে কাজ করার জন্যই। কিন্তু সমাজ বিপ্লবের পক্ষে আরো অনেক গান লিখতে ও গানে সুরারোপ করতে পারতেন যে শিল্পী, তিনি তো তাঁর কাঙ্ক্ষিত পথ ধরে আর এগোতেই পারলেন না।

এ ক্ষেত্রেও দায়টা তাঁর নয়, আন্দোলনের অপারগতার বটে।উন্নয়নের আলোর নিচে যে অন্ধকার জমে উঠছে, সে ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যে হচ্ছে না, তা নয়। হচ্ছে। বিশ্বজুড়েই চলছে প্রতিবাদ। যেমন—বাংলাদেশেরই ছোট্ট এক গ্রামের ছোট্ট এই খবর। লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ এলাকায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এক পক্ষের নেতৃত্বে ভাড়াটে লোকজন দেশীয় অস্ত্র দিয়ে বৃদ্ধ হাসমতউল্লার ওপর আক্রমণ চালায় এবং তাঁকে হত্যা করে। এর প্রতিবাদে গ্রামবাসী একত্র হয়ে একটি মানববন্ধন করেছে। তারা দোষীদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির দাবি জানিয়েছে। গ্রামবাসীর এটি করার কোনো দায় ছিল না। কিন্তু তারা যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজটি করেছে, তাতে বোঝা যায় বিচ্ছিন্নতা সত্য হলেও মনুষ্যত্ব নিঃশেষ হয়ে যায়নি।

বড় আকারেও প্রতিবাদ হচ্ছে। যেমন—চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনা বিদেশি কম্পানিকে ইজারা দেওয়ার আয়োজনের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষ, বন্দরের শ্রমিক এবং বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিরোধে মিলিত হয়েছে। ওই প্রতিরোধ মনে হয় শক্তিশালী হবে। বন্দরের উন্নয়নের নাম করেই বন্দর ইজারা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এই উন্নয়ন যে দেশের জন্য বিপদ ডেকে আনবে, এই বোধটা মানুষের মধ্যে জেগে উঠেছে। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষার জন্য বড় একটি আন্দোলন হয়েছে, তাতে সাফল্যও এসেছে। যে কমিটি কাজটি করেছিল, সেটি অবশ্য এখন আর কার্যকর নেই, কিন্তু বন্দর রক্ষার জন্য নতুন উদ্যোগে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, হতাশার অন্ধকারে সেটি আলোর রেখা বৈকি।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যে কুলাবে না—এই উপলব্ধি এখন সুবিস্তৃত। বিস্তার বাড়ছে। পুঁজিবাদের চরমতম ফ্যাসিবাদী চেহারা এখন আর লুকানো-ছাপানো নেই। পুঁজিবাদীদের হাতে পড়ে গণমাধ্যম মনুষ্যত্ব নিধনের সহযোগীতে পরিণত হয়েছে। পুঁজিবাদকে তাই এখন অনেকেই বলছে মানুষখেকো। আক্ষরিক অর্থে মানুষখেকো না হলেও মনুষ্যত্বের জন্য সে যে বিরাট হুমকি, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। আর মনুষ্যত্বই যদি না রইল, তাহলে মানুষের রইলাটা কী? ওদিকে পুঁজিবাদের বিকল্প কী, সেটি কিন্তু পরিষ্কারভাবে বলা হচ্ছে না। সংস্কারে যে কুলাবে না সেটি মানলেও, বিকল্প যে সমাজতন্ত্র, সেটি মানতে এখনো আপত্তি দেখা যাচ্ছে। এর একটি বড় কারণ অবশ্য এই যে মিডিয়া রয়ে গেছে পুঁজিবাদীদের দখলে এবং মিডিয়ার হাতে এতই ক্ষমতা যে দিনকে সে রাত এবং রাতকে দিন বানাতে পারে। সমগ্র বিশ্বের পুঁজিবাদবিরোধীদের পক্ষে আজ তাই অপরিহার্য ও অনিবার্য যে উপলব্ধি, সেটি হলো ব্যক্তিমালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা। সমাজতন্ত্রের মূল ব্যাপারটিই কিন্তু হচ্ছে ওই সামাজিক মালিকানা। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’—এই আওয়াজের সঙ্গে আরো একটি আওয়াজ ছিল। সেটি হলো ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’।

ওই দ্বিতীয় আওয়াজটিই এখন হতে পারে ‘সমাজ বিপ্লবীরা এক হও’। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিলম্বে হলেও বাংলাদেশের সমাজতন্ত্রীরা যে শেষ পর্যন্ত একটি যুক্তফ্রন্ট গড়ার সংকল্প নিয়েছেন, তারও ওই একই আওয়াজ ওঠা প্রয়োজন। জানিয়ে দেওয়া দরকার যে ঐক্য চাই সমাজ পরিবর্তনের জন্য এবং সমাজ পরিবর্তন কিছুতেই ঘটবে না, যদি না পুঁজিবাদবিরোধীরা সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়ে পুঁজিবাদকে বিদায় করতে সক্ষম হন। পুঁজিবাদ এখন সারা বিশ্বের এক নম্বর সমস্যা, সমাজ বিপ্লবী আন্দোলনটিও তাই হওয়া চাই আন্তর্জাতিক, কিন্তু প্রতিটি দেশেই সমাজ বিপ্লবীদের মোকাবেলা করতে হবে স্থানীয় বুর্জোয়াদের, যারা বিশ্ব পুঁজিবাদের তাঁবেদার এবং স্থানীয় সংরক্ষক। বাংলাদেশে বুর্জোয়াদের দুই চেহারা—একটি ইহজাগতিক, অপরটি ধর্মীয় মৌলবাদী। এরা কখনো একসঙ্গে থাকে, কাঁধে কাঁধ মেলায়; আবার কখনো বিরোধিতায় নামে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকল্প হচ্ছে সামাজিক মালিকানা অর্থাৎ সমাজতন্ত্র। সে ব্যবস্থার প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনের ওপর নিষ্পেষণ চলে এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয় সমাজ বিপ্লবীদের নিজেদের ভেতর অনৈক্য ও বিভ্রান্তি। ফলে প্রতিক্রিয়াশীলতার এখন বাড়বাড়ন্ত। বাংলাদেশেও প্রতিক্রিয়াশীলতার জোয়ার তৈরির লক্ষণ-বিলক্ষণ দেখা গেছে। যেমন—বেগম রোকেয়াকে মুরতাদ ও কাফির আখ্যা দেওয়া। ঘটনাটি ঘটেছে গত ৯ ডিসেম্বরে, যে তারিখটি রোকেয়ার জন্ম দিবস, আবার মৃত্যু দিবসও। কাজটি করেছেন অন্য কেউ নন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের এক সহযোগী অধ্যাপক। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেছেন যে মতামতটি ওই অধ্যাপকের নিজস্ব। সেটি আমরা যে জানি না, তা তো নয়, কিন্তু এই রকমের বিষাক্ত মতাদর্শ নিয়ে একজন মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হন কিভাবে, সে প্রশ্ন তো রয়েই যায়।

প্রকাশ্যে এমনভাবে রোকেয়াকে আক্রমণ গত ১০০ বছরে কেউ করেছে বলে আমরা জানি না। রোকেয়া বরং ক্রমাগত পাত্র হয়ে উঠেছেন বাংলাভাষী মানুষের জন্য সম্মান ও গৌরবের। তাঁর রচনা বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং অত্যন্ত পশ্চাৎপদ একটি সমাজে সব প্রতিবন্ধকতাকে ছিন্ন করে একজন নারী একাকী কেমন করে অসাধারণ সব বিষয়ে চিন্তা করলেন এবং অমন সুন্দরভাবে উপস্থাপন করলেন, সে ঘটনা দেশে-বিদেশে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। ১০০ বছরের ধারাবাহিকতায় আজ আমরা এতটাই উন্নত হয়েছি যে অনুপস্থিত রোকেয়াকে অকল্পনীয় কটু ভাষণ শুনতে হচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদ এখন নৃশংস ফ্যাসিবাদী রূপ ধারণ করেছে। তাদের নানা ধরনের আক্রমণ আরো বাড়বে, যদি না উন্নয়নের ওই ধারাকে হটিয়ে দিয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার পথে এগোনো সম্ভব হয়। মানুষের পক্ষে তার মনুষ্যত্বকে রক্ষা করে বেঁচে থাকার সর্বত্রব্যাপী ও সর্বজনীন এমন চ্যালেঞ্জ মানবসভ্যতার লিখিত ইতিহাসে আগে কখনো এসেছে বলে আমরা জানি না।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram