ঢাকা
১০ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ১১:৪১
logo
প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬

‘মুসলিম হয়ে আমরা কী অপরাধ করেছি’, প্রশ্ন আসামের মুসলমানদের

৫০ বছর বয়সী ফাজিলা খাতুন কান্নার সুরে বলেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ গেলে তো আমাদের নাগরিকত্বই শেষ হয়ে যাবে। চিন্তায় ঘুমাতে পারি না, কোনো কিছু মুখে দিতেই ভালো লাগে না। আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়ার পরে এখন যদি নাগরিকত্বও না থাকে, তাহলে আমরা কোথায় যাব? তিনি ভারতের আসামের বাসিন্দা।

ফাজিলা খাতুন এখন প্লাস্টিকের চাদর দেওয়া ছোট ছোট বস্তির ঘরে থাকেন। তার মতো আরও প্রায় ৩৩১টি পরিবার দেড় মাস আগে লুটুমারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নানা গ্রাম থেকে নগাঁও জেলার এই অঞ্চলে উঠে এসেছেন।

তাদের গ্রাম জঙ্গলের জমিতে জবরদখল করে গড়ে উঠেছিল – এই যুক্তিতে ভারত সরকার একটানা দুদিন ধরে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালায় গত ২৯ নভেম্বর থেকে। ফাজিলা খাতুনদের উচ্ছেদ করে প্রায় ছয় হাজার বিঘা জমি পুনরুদ্ধার করেছে ভারতীয় সরকার।

এরকমই উচ্ছেদ অভিযান প্রদেশটির আরও অনেক এলাকায় চালানো হয়েছে। উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলো অন্যত্র সরে গেছে, ফলে আসামের ভোটার তালিকায় যে বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া চলছে, তার অধীনে এদের শুনানির নোটিশ পাঠাচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশের মতো আরও কয়েকটি রাজ্যে যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর চলছে, তার সঙ্গে আসামের ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের ফারাক আছে।

ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের একটি নোটিশ দেখিয়ে ফাজিলা খাতুন বলেন, নোটিশ পাওয়ার পর আমি আমার ছেলেদের নিয়ে যতগুলি অফিসে যেতে বলা হয়েছিল, প্রত্যেকটিতে গিয়েছিলাম। কর্মকর্তাদের প্রত্যেকটা নথি দেখিয়েছি। তিন-চার বার শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। না গেলে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হত।

আমার মনে এখনও ভয় আছে। দুশ্চিন্তা হচ্ছে, নাগরিকত্ব না থাকলে কী হবে? কেউ কেউ বলছেন, আমাদের নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি কার কাছে যাব, কী করব কিছুই ভাবতে পারছি না, হতাশা নিয়ে বলছিলেন ফাজিলা।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযানের অংশ হিসেবে যাদের বাড়িঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছিল তাদের ভোটার তালিকায় বিশেষ সংশোধন বা এসআর প্রক্রিয়ার শুনানির জন্য যেতে হয়েছিল।

উচ্ছেদ হওয়ার পরে এখানে ঘর বেধেছে প্রায় ৩৩০টি পরিবার
এদের শুনানিতে ডাকার একটি বড় কারণ হলো যে যাদের উচ্ছেদ করা হয়, তাদের ঠিকানা এখন বদলে গেছে। অনেক ক্ষেত্রেই পাল্টে গেছে বিধানসভা কেন্দ্রও।

যেমন ফাজিলা খাতুনদের এখন হোজাই জেলার নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে যেতে হচ্ছে। একই রকম নোটিশ পেয়েছেন তারই প্রতিবেশী, ৫১ বছর বয়সী মিনারা বেগমও।

তিনি বলেন, আমরা যে জমিতে ৪০ বছর ধরে বসবাস করছিলাম, সেই জমিটা নাকি সরকারের, তাই আমাদের বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়। থাকার জায়গা ছিল না, তাই এখানে অন্যলোকের জমিতে প্লাস্টিকের ছাউনি দেওয়া ঘর করে থাকতে হচ্ছে। এখন ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার কথা হচ্ছে। নোটিশ পাওয়ার পর এ পর্যন্ত কয়েকদিন শুনানিতে যেতে হয়েছে। সব নথি জমা করেছি, কিন্তু আমাদের তাও উত্ত্যক্ত করা হচ্ছে। জানি না দশই ফেব্রুয়ারি কী হবে!

১০ ফেব্রুয়ারি আসামের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করার কথা। এই দিনটি নিয়ে তাই বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে।

আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের কটূক্তি করে 'মিঞাঁ' বলা হয়ে থাকে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা সাম্প্রতিক সময়ে লাগাতার মিঞাঁ মুসলমানদের নিশানা করে নানা আক্রমণাত্মক কথা বলে চলেছেন।

গত বছর রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন ঘোষিত হওয়ার পরে ২০ নভেম্বর মুখ্যমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, যতদিন আমি মুখ্যমন্ত্রী আছি, কোনো মিঞাঁ শান্তিতে থাকতে পারবেন না। এটা নিশ্চিত। যে মিঞারা সন্দেহভাজন নাগরিক তাদের হয়রানি করাই আমার কাজ। আমাকে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার থেকে সরিয়ে দেওয়া হলেই মিঞাঁ সম্প্রদায় শান্তি পেতে পারে।

মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের জন্য তাঁর নির্বাচনী কৌশলের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এরপর থেকেই তিনি মিঞাঁ মুসলমানদের বিরুদ্ধে একপ্রকার লড়াই শুরু করেন।

মিঞাঁ মুসলমানদের নিয়ে এ বছর জানুয়ারি মাসে মুখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেন, যে যেভাবে পারবেন, মিঞাঁদের হেনস্থা করুন। আপনারাও তাদের কষ্ট দিন। রিকশার ভাড়া যদি পাঁচ টাকা চায়, তাহলে আপনি চার টাকা দিন। হয়রানি হলেই তারা আসাম থেকে চলে যাবে।

মুখ্যমন্ত্রী সেদিনই আরও বলেন, মিঞাঁদের বিষয়টা কোনো ইস্যু নয়। হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং বিজেপি সরাসরি মিঞাঁদের বিরুদ্ধে। এখন আমি সবাইকে উৎসাহিত করছি যাতে মিঞাঁদের হেনস্থা করা হয়।

মুখ্যমন্ত্রীর ওই বক্তব্য শুনেছেন মিনারা বেগম। তার প্রশ্ন, কেন আমাদের হয়রানি করা হচ্ছে? আসাম সরকার কী করতে চাইছে?

সংবাদে দেখেছি যে মুখ্যমন্ত্রী বলছেন যে মিঞাঁ মুসলমানদের হেনস্থা চালাতেই থাকবেন। কিন্তু আমরা তো এদেশেরই নাগরিক। মুসলমান হয়ে আমরা কি কোনো অপরাধ করে ফেলেছি? তাই যদি হয় সরকার আমাদের একেবারে মেরে কেন ফেলছে না? এত হেনস্থার থেকে ভাল হত যদি আমাদের সরাসরি গুলি করে মেরে ফেলত।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +880 2-8878026, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram