ঢাকা
logo
প্রকাশিত : September 2, 2026

এক কম্পিউটার থেকে ৩.৫ মিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠান, শ্রীমঙ্গলে ৩৬০ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান

সৈয়দ ছায়েদ আহমদ, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি: একসময় স্বপ্ন ছিল ব্যাংকার হওয়ার। বিসিএস দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যাওয়ার ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু প্রচলিত চাকরির নিরাপদ পথ বেছে না নিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মজগতের দিকে পা বাড়ান শ্রীমঙ্গলের তরুণ জাকির হোসেন। মাত্র একটি কম্পিউটার ও সীমিত পরিসরে শুরু করা সেই উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে কোটি টাকার বিনিয়োগ ও মিলিয়ন ডলারের সম্পদমূল্যের একটি ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘ইনপুট বাংলা’-তে তিন শিফটে কাজ করছেন প্রায় ৩৬০ তরুণ-তরুণী।

২০১৫ সালের শুরুর দিকে শ্রীমঙ্গল শহরের মৌলভীবাজার সড়কের ১ নম্বর পুল এলাকায় ছোট একটি ভাড়া ঘরে শুরু হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা। তখন ছিল মাত্র একটি কম্পিউটার। ছিল না বড় কোনো অবকাঠামো কিংবা বিপুল পুঁজি। ছিল প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দৃঢ়তা।

এর আগে শ্রীমঙ্গল দি বাডস্ রেন্সিডেসিয়্যাল মডেল স্কুল এন্ড কালেজ থেকে এইচএসসি এবং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে অনার্স সম্পন্ন করেন জাকির। পড়াশোনা শেষে তাঁর লক্ষ্য ছিল ব্যাংকে চাকরি করা। একই সঙ্গে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল।

কিন্তু ২০১৪ সালের শেষ দিকে ঢাকায় এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় তাঁর চিন্তার জগতে পরিবর্তন আনে। ওই বন্ধু ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, অনলাইনভিত্তিক কাজের বিস্তৃতি এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানে এর সম্ভাবনা জাকিরকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। শেষ পর্যন্ত চাকরির প্রচলিত পথ বাদ দিয়ে বন্ধুর সঙ্গে অংশীদারত্বে শ্রীমঙ্গলে ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

প্রতিষ্ঠান শুরুর পরও থেমে থাকেননি জাকির। কাজের পাশাপাশি প্রায় আড়াই বছর ঢাকার বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠানে গিয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় কাজ করলেও পারিশ্রমিক নেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল অর্থ উপার্জনের আগে কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করা।

ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ‘ইনপুট বাংলা’র পরিধি। একটি কক্ষ থেকে শুরু করে পরে পাশের আরও দুটি ঘর যুক্ত করা হয়। তাতেও জায়গা না হওয়ায় একসময় বাসা থেকেই কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। অবশেষে ২০২৫ সালে সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ সবুজবাগ রোডে নতুন পরিসরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদমূল্য প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে জানিয়েছেন জাকির হোসেন। প্রতিষ্ঠানটিতে এখন প্রায় ৩৬০ জন তরুণ-তরুণী তিন শিফটে কাজ করছেন।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ‘ইনপুট বাংলা’র কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বড় পর্দার কম্পিউটারের সামনে বসে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিভিন্ন বয়সী তরুণ-তরুণীরা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীও রয়েছেন। কেউ শিক্ষার্থী, কেউ চাকরিপ্রত্যাশী, আবার কেউ তুলনামূলক কম শিক্ষিত হয়েও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে কাজ করছেন।

শ্রীমঙ্গল শহরে বসেই তাঁরা কাজ করছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকাসহ প্রায় ৩০টি দেশের ক্লায়েন্টের বিভিন্ন ধরনের কাজ পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।

এসব কাজের মধ্যে রয়েছে প্রোপার্টি ম্যানেজমেন্ট, ডাটা এন্ট্রি, ডাটা রিসোর্স, ভার্চুয়াল ল’ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ইমিগ্রেশন ল’ ডাটা এন্ট্রি, ডাটা ট্রান্সফার, ফরম প্রসেসিং, ই-মেইল মার্কেটিং, গ্রাফিকস ডিজাইন মার্কেটিং ও রিমোট ভিডিও মনিটরিং সার্ভিস।

প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন জানান, মোটামুটি ইংরেজিতে দক্ষ বিভিন্ন বয়সী তরুণ-তরুণীদের এখানে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়। নতুনদের প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন মাস পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের জন্য কোনো অর্থ নেওয়া হয় না। প্রশিক্ষণকালীন সময়ে পারিশ্রমিক না থাকলেও দক্ষতা অর্জনের পর যোগ্যতা অনুযায়ী সম্মানজনক বেতন দেওয়া হয়।

তাঁর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটি শুধু কর্মী নিয়োগের জায়গা হিসেবে কাজ করছে না; বরং তরুণদের ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি করার লক্ষ্যেও কাজ করছে। এখানে কয়েক বছর কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর অনেকে নিজেরাই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবেন।

ইতোমধ্যে ‘ইনপুট বাংলা’ থেকে ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কয়েকজন নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে সফল হয়েছেন বলেও জানান তিনি।

চা শ্রমিক পরিবারের তরুণদেরও সুযোগ
শুধু শহরের শিক্ষিত তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই প্রতিষ্ঠানটির কর্মসংস্থানের সুযোগ। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীদেরও এখানে কাজের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে চা শ্রমিক পরিবারের অনেক ছেলে-মেয়ে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত।
দূরবর্তী এলাকার কর্মীদের জন্য রয়েছে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থাও। রাতের শিফট শেষে কর্মীদের নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী।

বেড়েছে আয় ও ব্যবসার পরিধি
প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরে জাকির হোসেন জানান, ২০২৪ সালে ‘ইনপুট বাংলা’র বার্ষিক টার্নওভার ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ১৪ হাজার ডলারে। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই প্রতিষ্ঠানটির টার্নওভার ২ লাখ ৮৪ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।

তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে।

জাকির বলেন, এই অবস্থানে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করতে হয়েছে। শুরুর দিকে প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেছেন। ঘুম ও খাওয়ারও ঠিকঠাক সময় ছিল না। সেই শ্রম, ধৈর্য ও সময়ের ফল হিসেবেই আজকের অবস্থান তৈরি হয়েছে।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও সরকারি সহায়তার দাবি
ফ্রিল্যান্সিং ও প্রযুক্তিখাতের বিকাশে সরকারের আরও সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন জাকির। বর্তমানে কর-সুবিধা ছাড়া উল্লেখযোগ্য সরকারি সহায়তা পাননি বলে জানান তিনি। তবে এ নিয়ে সরকারের প্রতি কোনো অভিযোগ নেই তাঁর।

তাঁর মতে, সময়োপযোগী সরকারি নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করা গেলে দেশের প্রযুক্তিখাত আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, নির্ভরযোগ্য ব্যাকআপ বিদ্যুৎ এবং উন্নত কর্মপরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা ও আস্থাকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন। অনেক ক্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ব্যবস্থার নির্দিষ্ট অংশের অ্যাক্সেস রাখেন। একইভাবে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানও ক্লায়েন্টদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নির্দিষ্ট অ্যাক্সেস নিয়ে থাকে।

শ্রীমঙ্গলকে ‘টেক সিটি’ করার স্বপ্ন
মফস্বলের তরুণদের নিয়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করার স্বপ্ন দেখছেন জাকির হোসেন। তাঁর বিশ্বাস, সরকারি ঋণ সহায়তা ও প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া গেলে শ্রীমঙ্গলের মতো মফস্বল শহরেও আরও অনেক প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে।
পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে শ্রীমঙ্গলকে একটি সম্ভাবনাময় ‘টেক সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে তৈরি পোশাকশিল্পের মতোই জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বানও জানান তিনি। তাঁর মতে, এই খাত তরুণদের কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় সুযোগ সৃষ্টি করছে।

একটি কম্পিউটার নিয়ে ছোট্ট একটি ঘরে শুরু করা উদ্যোগ আজ কয়েক শত তরুণের কর্মসংস্থানের ঠিকানা। ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন ছেড়ে প্রযুক্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া জাকির হোসেনের পথচলা তাই শুধু একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয়; বরং মফস্বল শহরের তরুণদের দক্ষতা, সম্ভাবনা ও বৈশ্বিক কর্মবাজারে নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার এক বাস্তব উদাহরণ।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram