

মোঃ মোকাররম হোসাইন, কালাই (জয়পুরহাট) প্রতিনিধি: কৃষকের উৎপাদিত সবজি সংরক্ষণ করে সুবিধাজনক সময়ে বাজারজাত এবং সংরক্ষণজনিত অপচয় কমানোর লক্ষ্যে জয়পুরহাটের কালাই হাট ও বাজারে প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত মিনি কোল্ড স্টোরেজের উদ্বোধন করা হয়েছে। কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় নির্মিত এই সংরক্ষণাগার চালু হওয়ায় স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকেরা উৎপাদিত সবজি কিছু সময় সংরক্ষণ করে বাজার পরিস্থিতি বুঝে বিক্রির সুযোগ পাবেন।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টায় কালাই হাট ও বাজার এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে মিনি কোল্ড স্টোরেজের উদ্বোধন করেন জনপ্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এমপি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক মো. আল মামুন মিয়া, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজু আলম সরকার, কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুনুর রশিদ, কালাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইব্রাহিম হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক মওদুদ আলম সরকার, কালাই পৌর বিএনপির আহ্বায়ক সাজ্জাদুর রহমান সোহেলসহ কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও কৃষকেরা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কালাই একটি কৃষিপ্রধান এলাকা। এখানকার কৃষকেরা বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করলেও উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় বাজারে দাম কম থাকলেও তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রি করতে হয়। বিশেষ করে মৌসুমে একই সময়ে বাজারে বিপুল পরিমাণ সবজি উঠলে দাম পড়ে যায়। এতে উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে কৃষকের লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়।আবার বিক্রি না হওয়া সবজি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ে। এমন বাস্তবতায় হাট ও বাজারের কাছে মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপনকে কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন এই সংরক্ষণাগারে সবজি সংরক্ষণের সুযোগ থাকায় কৃষকরা বাজারে দাম কম থাকার সময় পণ্য বিক্রি না করে কিছুদিন অপেক্ষা করতে পারবেন। বাজারদর তুলনামূলক ভালো হলে সংরক্ষিত সবজি বাজারজাত করে বাড়তি দাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে একদিকে অপচয় কমবে, অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনপ্রশাসন ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এমপি বলেন, কৃষকের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত কৃষিপণ্যের সঠিক সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। কৃষক যেন উৎপাদনের পরপরই কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য না হন, সে জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষণ সুবিধা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের কৃষকেরা অনেক পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করেন। কিন্তু অনেক সময় সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় বাজারে দাম কমে গেলে তারা ক্ষতির মুখে পড়েন। মিনি কোল্ড স্টোরেজ চালুর ফলে কৃষকেরা উৎপাদিত সবজি কিছু সময় সংরক্ষণ করে বাজার পরিস্থিতি বুঝে বিক্রি করার সুযোগ পাবেন। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচের ন্যায্য প্রতিফলন পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, কৃষিকে শুধু উৎপাদননির্ভর রাখলে হবে না।উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিটি ধাপে আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো গেলে কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি ভোক্তাদের জন্যও বাজার স্থিতিশীল রাখা সহজ হবে।
তিনি বলেন, কৃষককে শক্তিশালী করতে হলে তাঁর উৎপাদিত পণ্যের বাজার নিশ্চিত করতে হবে। কৃষকের ঘাম ও শ্রমের যথাযথ মূল্য দিতে হবে। সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও উন্নয়ন কর্মসূচির সুফল যেন প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
কালাইয়ের মতো কৃষিপ্রধান এলাকায় সংরক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় চাহিদা ও কৃষকের প্রয়োজন বিবেচনা করে ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। মিনি কোল্ড স্টোরেজটি যথাযথভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এটি কৃষকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, সবজি উৎপাদনে খরচের বড় একটি অংশ যায় পরিবহন ও বাজারজাতকরণে। বাজারে দাম কম থাকলে পণ্য ধরে রাখার সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। নতুন সংরক্ষণাগারটি কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে সেই চাপ অনেকটাই কমবে বলে তাঁরা আশা করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মিনি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের পাশাপাশি এর সঠিক ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকেরা যাতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সংরক্ষণ সুবিধা পান, সংরক্ষণ খরচ যেন কৃষকের নাগালের মধ্যে থাকে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বা মধ্যস্বত্বভোগীর নিয়ন্ত্রণ তৈরি না হয়,এসব বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি। তাদের মতে,শুধু সংরক্ষণাগার নির্মাণ করলেই কৃষকের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না। এর সঙ্গে উৎপাদন পরিকল্পনা, বাজারদর, পরিবহন ও সরাসরি বাজারজাতকরণের সমন্বয় ঘটাতে পারলে কৃষক প্রকৃত সুফল পাবেন।
কালাইয়ের কৃষকেরা আশা করছেন, প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই মিনি কোল্ড স্টোরেজটি নিয়মিত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলে এটি শুধু সবজি সংরক্ষণের স্থাপনা হিসেবে নয় বরং স্থানীয় কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও কৃষি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার একটি কার্যকর উদ্যোগে পরিণত হবে।
