

মো. নাজমুল হোসেন ইমন, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় অনুমোদন ও লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার অভিযোগ নতুন নয়। কয়েক বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কোনোটি বন্ধ, কোনোটি সিলগালা এবং কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাগজপত্র হালনাগাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযান ও ব্যবস্থা নেওয়ার পরও কিছু প্রতিষ্ঠান আবার চালু হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বৈধ অনুমোদন থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত জনবল, অবকাঠামো, চিকিৎসা সরঞ্জাম, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা থাকা জরুরি। এসবের ঘাটতি থাকলে রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও বাঁশখালীতে গত কয়েক বছরে পরিচালিত সরকারি অভিযানের তথ্য বিশ্লেষণ করলেও বিষয়টির চিত্র পাওয়া যায়।
২০২৪ সালে আনোয়ারায় স্বাস্থ্য বিভাগের অভিযানে আটটি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বারশত ইউনিয়নের সূর্যের হাসি নেটওয়ার্ক ক্লিনিক, মহালখান বাজারের ডক্টরস পয়েন্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চাতরী চৌমুহনী বাজারের আমিন বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং আনোয়ারা মা ও শিশু হাসপাতালের লাইসেন্স ছিল না।
এ ছাড়া চাতরী চৌমুহনী বাজারের দি ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও স্টার ক্লিনিক্যাল ল্যাবের লাইসেন্সের মেয়াদ হালনাগাদ ছিল না বলে অভিযানের সময় তথ্য পাওয়া যায়। মহালখান বাজারের ছায়াপথ ক্লিনিক ও টাচ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংশ্লিষ্টরা অভিযানের খবর পেয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে চলে যান বলে তৎকালীন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে ২০২০ সালেও আনোয়ারায় অনুমোদন ও লাইসেন্স-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান হয়েছিল। ফলে একই উপজেলায় কয়েক বছর ধরে এমন অভিযোগ থাকার পরও এসব প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা কী, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কর্ণফুলীর শিকলবাহা মা ও শিশু হাসপাতালকে ঘিরে বিষয়টি আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের মার্চে লাইসেন্স না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে তৎকালীন উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছিল।
কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে একই প্রতিষ্ঠানে এক নবজাতকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় স্বজনেরা হাসপাতালে ভাঙচুর করেন।
তাহলে যে প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স না থাকার কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সেটি পরে কীভাবে আবার কার্যক্রমে ফিরল—এ প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স ও অনুমোদনের অবস্থা কী, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরিষ্কার হওয়া দরকার।
বাঁশখালীতেও অনুমোদনহীন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযান হয়েছে।
২০২২ সালের ২৯ আগস্ট লাইসেন্স না থাকায় ইউনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মিনি ল্যাব, মা-মনি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ন্যাশনাল হাসপাতাল (প্রা.) লিমিটেড এবং জেনারেল হাসপাতাল চাম্বল বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে তৎকালীন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এরপর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাঁশখালীতে আবারও অভিযান চালানো হয়। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স দেখাতে না পারা এবং কোথাও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট না থাকার তথ্য পাওয়া যায়। একটি প্রতিষ্ঠানের ল্যাবের ফ্রিজে সবজি ও ওষুধ একসঙ্গে রাখার বিষয়টিও অভিযানে ধরা পড়ে।
শুধু পুরোনো অভিযান নয়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় লাইসেন্সহীন হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পুঁইছড়ি, নাপোড়া, জলদী, কালীপুর, বৈলছড়ি, চাম্বল ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন প্রতিষ্ঠানের কথা প্রতিবেদনে উঠে আসে।
অভিযানের পর নজরদারি কোথায়?
সরকারি অভিযান পরিচালনার পর প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে কি না, আবার চালু হয়েছে কি না, কিংবা পরবর্তীতে বৈধ লাইসেন্স নিয়েছে কি না—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কারণ শুধু অভিযান চালিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। পরবর্তী সময়ে ওই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা না হলে একই জায়গায় আবারও চিকিৎসাসেবা চালু হওয়ার সুযোগ থাকে।
বিশেষ করে আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর মতো শিল্পায়ন ও জনসংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এমন এলাকায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও সক্ষমতা নিয়মিত যাচাই করা জরুরি।
রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রোগীর নিরাপত্তা। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকা, প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা কিংবা জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকলে সাধারণ চিকিৎসাও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অস্ত্রোপচার, প্রসূতি সেবা, অ্যানেসথেশিয়া ও জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। এসব সেবা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, চিকিৎসক, জনবল ও অবকাঠামো যাচাই করা প্রয়োজন।
হালনাগাদ তালিকা প্রকাশের দাবি
সচেতন নাগরিকদের দাবি, চট্টগ্রাম জেলার সব বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একটি হালনাগাদ উপজেলা-ভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করা হোক।
কোন প্রতিষ্ঠানের বৈধ লাইসেন্স আছে, কোনটির মেয়াদ শেষ, কোনটি নবায়নের অপেক্ষায় এবং কোন প্রতিষ্ঠানকে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—এসব তথ্য জনগণের জন্য সহজে যাচাই করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
এতে রোগীরা চিকিৎসা নেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানের বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবেন।
চট্টগ্রামে অনুমোদনহীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের প্রকৃত সংখ্যা কত, কতটি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন হয়নি এবং গত কয়েক বছরে কতটি প্রতিষ্ঠানকে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে জানতে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জনের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও লাইসেন্সের বিষয়টি নিয়মিত যাচাইয়ের আওতায় থাকা প্রয়োজন। তবে মাঠপর্যায়ে সেই তদারকি কতটা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
চট্টগ্রামে স্বাস্থ্যসেবার নামে অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা এবং অভিযানের পরও কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়মবহির্ভূতভাবে চালু আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। কারণ চিকিৎসাসেবায় সামান্য অনিয়মের মূল্যও একজন রোগীকে জীবন দিয়ে দিতে হতে পারে।
