

ফরিদগঞ্জ (চাঁদপুর) প্রতিনিধি: একসময় নদী মানেই ছিল জীবন। আর সেই জীবনের অন্যতম প্রতীক ছিল চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদী। যে নদীকে ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করত ফরিদগঞ্জের হাজারো পরিবার। প্রমত্তা স্রোত, লঞ্চ, টলার, নৌকা, জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ত সময়, নদীঘেঁষা হাট-বাজার, শিশু-কিশোরদের জলকেলি সব মিলিয়ে নদীটি ছিল এই ফরিদগঞ্জের প্রাণ। আজ সেই ডাকাতিয়া যেন নীরব দীর্ঘশ্বাস ফেলে অপেক্ষা করছে নিজের শেষ পরিণতির। ধীরে ধীরে গুনছে নিজের মৃত্যুপ্রহর। কচুরিপানার চাপে হারিয়েছে নিজের যৌবন।
বছরের পর বছর পলি জমেছে, কোথাও কচুরিপানার দখল, কোথাও অবৈধ স্থাপনা, আবার কোথাও অপরিকল্পিত বাঁধ ও সংযোগ সড়কের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বর্ষা ছাড়া বছরের অধিকাংশ সময় নদীর অনেক অংশেই পানি থাকে না। কোথাও কোথাও নদীর বুক এতটাই ভরাট হয়ে গেছে যে সহজেই হেঁটে পার হওয়া যায়।
ডাকাতিয়া নদীকে ঘিরেই একসময় গড়ে উঠেছিল ফরিদগঞ্জের বহু জনপদ। কৃষকরা নদীর পানি ব্যবহার করে জমিতে সেচ দিতেন। জেলেরা দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ব্যবসায়ীরা নৌপথে পণ্য পরিবহন করতেন। আর সন্ধ্যায় নদীর ঘাটে জমে উঠত মানুষের আড্ডা। আজ সেই দৃশ্য আর নেই।
নদীর পানি কমে যাওয়ায় মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। দেশীয় মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অনেক জেলে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। কৃষকরা সেচের জন্য নির্ভর করছেন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর, যা পরিবেশের জন্যও উদ্বেগজনক।
স্থানীয় জেলে হরলাল চন্দ্র দাস ও বরমন চন্দ্র দাস জানান, একটা সময় এই নদীতে মাছ ধরেই আমাদের সংসার চলত। এখন বর্ষা ছাড়া নদীতে তেমন পানি থাকে না, মাছও পাওয়া যায় না। তাই বাধ্য হয়ে অনেক বছর আগে অন্য পেশা বেছে নিয়েছি।
ডাকাতিয়া নদীর সংকট শুধু একটি নদীর সংকট নয়; এটি একটি পুরো পরিবেশব্যবস্থার সংকট। নদীতে পানি কমে যাওয়ায় জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর সংখ্যা কমছে। অনেক জলচর পাখি আগের মতো দেখা যায় না। নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল-বিলও শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে কৃষি, মৎস্য এবং জীববৈচিত্র্য—সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নদী বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে; নদী মরলে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো ফরিদগঞ্জ।
চান্দ্রা গাজীপুর এলাকার সিরাজ মিয়া, আব্দুর রহমানসহ আরও অনেকেই বলেন, এই ডাকাতিয়া নদীতে নৌযান ব্যবহার করে আমরা পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতাম। সড়কপথে বিভিন্ন কারণে পরিবহন ভাড়া বেশি পড়তো, আর নদীপথে ছিল কম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কচুরিপানার কারণে এখন আগের তুলনায় নৌযান চলাচল করতে পারছে না। তারপরও কচুরিপানার জট সরিয়ে নৌযান চালাতে হয় আমাদের। কচুরিপানা অপসারণ করা গেলে নৌপথ ব্যবহারের উপযোগী হওয়ার পাশাপাশি জেলে সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপকৃত হবে।
নদী পাড়ের বাসিন্দা আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, এ ডাকাতিয়া নদী দিয়ে লঞ্চে যাতায়াত করে আমি এক সময়ে ঢাকা গিয়েছি, এখন সে নদীটি দখল আর দুষণে বিলুপ্তির পথে। ভাবতেই অবাক লাগে।
ফরিদগঞ্জের প্রবীণ বাসিন্দা মো. নুরু জামান জানান, কয়েক দশক আগেও বড় বড় নৌকা, ট্রলার, এমনকি যাত্রীবাহী লঞ্চও চলাচল করত ডাকাতিয়ায়। নদীর গভীরতা ছিল অনেক বেশি। বর্ষার সময় নদীতে ভরপুর পানি থাকতো। নৌকা চলত, আশেপাশের এলাকার মানুষ দেখতে আসতেন, নদীর পাড়ে ঘুরতে আসতো। নৌকায় করে জেলেরা মাছ ধরত। তবে কালের বিবর্তনে আজকের প্রজন্মের কাছে সেই গল্প মনে হতে পারে যেন রূপকথার মতো।
সচেতন মহলের পক্ষে মো. মামুনুর রশিদ পাঠান ও নুরুন্নবী নোমান বলেন, নদীর এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে দীর্ঘদিন নিয়মিত খননের অভাব, অবৈধ দখল ও স্থাপনা নির্মাণ, নদীতে বর্জ্য ও ময়লা ফেলা, স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি এবং নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব। এসব কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত হচ্ছে এবং ধীরে ধীরে নদীটি প্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষে আব্দুস সোবহান লিটন ও শাহাদাৎ হোসান টুটুল নদী রক্ষায় বিভিন্ন দাবি তুলে বলেন, শুধু মৌসুমি উদ্যোগ নয়, ডাকাতিয়া নদী রক্ষায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। তারা চান—নদীর অবৈধ দখল দ্রুত উচ্ছেদ, নিয়মিত খনন, নদীতে বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেটু কুমার বড়ুয়া জানান, ডাকাতিয়া নদীর কচুরিপানা অপসারণ, নদী খনন এবং উপজেলার ৯২টি খাল পুনঃখননের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডে চিঠি পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে কাজ শুরু করা হবে। তিনি আরও বলেন, "স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ যদি ডাকাতিয়া নদী থেকে কচুরিপানা অপসারণ করে, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সার্বিক সহায়তা করা হবে।
