

ছায়েদ আহামেদ, হাতিয়া (নোয়াখালী) প্রতিনিধি: সপ্তাহব্যাপী প্রবলধারার বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। গত তিনদিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে পানি। তবে পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে কৃষি ও মৎস্য খাতের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। একই সঙ্গে ঘরবাড়ি, গ্রামীণ সড়ক এবং ব্রিজ-কালভার্টেরও ক্ষতিসাধন হয়েছে। এরই মধ্যে উত্তর পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে নতুন করে লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ায় এতদ্অঞ্চলের সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
টানা বৃষ্টির প্রভাবে হাতিয়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় সব এলাকাতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে জনজীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ। ক্ষতির মুখে পড়েছেন নিম্নাঞ্চল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। কৃষি ও মৎস্য খাত প্রায় নাস্তানাবুদ হয়ে গেছে। পাশাপাশি কাঁচা ঘরবাড়ি ও গ্রামীণ সড়কেরও ক্ষতি হয়েছে। পৌরসভা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মাত্রা লক্ষ্য করা গেছে।
স্থানীয়দের মতে, মানবসৃষ্ট নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সেখানে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) হাতিয়া উপজেলা পরিষদের মাসিক সভায় কৃষি কর্মকর্তা জানান, প্রায় তিন হাজার ৫৭৭ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা।
একইভাবে বুধবার (১৫ জুলাই) সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের সমন্বিত প্রতিবেদনে বিভিন্ন খাতের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উপজেলার এক হাজার ৮৬৪টি পুকুর ও জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা।এছাড়া, দুই হাজারেরও বেশি বসতবাড়ি, প্রায় ১১ কিলোমিটার সড়ক এবং ৩২টি ব্রিজ ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, কৃষি ও মৎস্য খাতে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি। অনেক এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা পুরোপুরি কাটেনি। খাল-নালা ভরাট, অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত সরু ব্রিজ ও কালভার্ট এবং বিভিন্ন স্থানে অবৈধ প্রতিবন্ধকতার কারণে পানি নামতে দেরি হচ্ছে।
হাতিয়া পৌরসভার কৃষক হাজী আলতাফ হোসেন বলেন, "এবারের টানা বৃষ্টিতে কৃষি ও মাছের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পৌরসভা এলাকায়। চারদিকে মানবসৃষ্ট জটিলতার কারণে পানি বের হওয়ার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।" তাঁর আমনের বীজতলা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
হাতিয়া পৌরসভার কৃষি উপসহকারী হাসান মাহমুদ জানান, পৌরসভা এলাকার প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। টানা জলাবদ্ধতায় প্রায় ৯০ শতাংশ আমনের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। সবজি ক্ষেতও প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। তবে দ্রুত পানি নেমে গেলে আউশের ক্ষেত মোটামুটিভাবে সেরে উঠতে পারবে।
এদিকে, স্থানীয় চৌমুহনী ও সাগুরিয়া বাজারের সবজি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাজারে সবধরনের সবজির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এছাড়া, সাগরে নতুন করে লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ায় চাষীদের মনে আবারও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি, মৎস্য ও অন্যান্য খাতের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি ব্যক্তি ও সামাজিক উদ্যোগের সমন্বয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসনে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং পানি নিষ্কাশনের পথ সচল রাখতে প্রশাসনের কার্যক্রম চলমান থাকবে।
