

যশোর প্রতিনিধি: যশোরের একটি কলেজের প্রভাষকের বিরুদ্ধে যৌতুকের লোভে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে স্ত্রীকে মানসিক নির্যাতন, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা এবং পরিকল্পিতভাবে ‘মানসিক রোগী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী নাহিদ শারমীন এ অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করে সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত শিক্ষক মো. রহমত হোসেন যশোর সদর উপজেলার হামিদপুর আলহেরা ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক। ২০১৬ সালের ৯ জুলাই পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই স্বামী ও তার পরিবারের সদস্যরা যৌতুকের বিষয়ে বিভিন্ন কটূক্তি ও বিদ্রুপ করতে থাকেন। তারা প্রায়ই বলতেন, অন্যত্র বিয়ে করলে বেশি টাকা, জমি কিংবা বাড়ি পাওয়া যেত। এসব কথা শুনিয়ে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে নিয়মিত অপমান করা হতো।
নাহিদ শারমীনের দাবি, তিনি বিষয়গুলো স্বামীকে জানালেও তিনি কখনো প্রতিবাদ করেননি; বরং পরিবারের সদস্যদের পক্ষ নিয়েছেন। সংসার টিকিয়ে রাখার স্বার্থে বছরের পর বছর তিনি এসব মানসিক নির্যাতন নীরবে সহ্য করেছেন।
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে ব্যবসা, জমি কেনা ও অন্যান্য অজুহাতে তার বাবা ও বড় বোনের কাছে টাকা দাবি করা হয়। একপর্যায়ে তার বাবা এক লাখ টাকা দিলেও তা ঘোষিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়নি। প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী কিনে দেওয়ার পরিবর্তে স্বামী প্রায়ই বলতেন, ‘যা লাগে তোমার বাবার কাছে চাও।’
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে তাকে মানসিক রোগী হিসেবে প্রচার করা হয়। স্বামী শিক্ষক সহকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের কাছে তাকে ‘মানসিকভাবে অসুস্থ’ বলে পরিচয় দিতেন। ২০২৫ সালে তাকে গাইনি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গিয়ে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করানোরও অভিযোগ করা হয়েছে। পরে তাকে ঢাকায় বাবার বাড়িতে রেখে মানসিক চিকিৎসা করানোর জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং অন্যথায় যশোরে আর না পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয়।
নাহিদ শারমীনের ভাষ্য, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ একজন মানুষ। অন্যায় ও অপমানের প্রতিবাদ করায় তাকে পরিকল্পিতভাবে মানসিক রোগীর তকমা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। অভিযোগের সঙ্গে তিনি অডিও রেকর্ড, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র ও বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্স সম্পন্ন করার সনদ সংযুক্ত করেছেন। তার দাবি, এসব প্রমাণে ষড়যন্ত্রের বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সন্তান না হওয়ার জন্য এককভাবে তাকে দায়ী করা হয়েছে। স্বামী নিজে চিকিৎসা করাতে আগ্রহী না হয়ে বরং তার পরিবারকে চিকিৎসার ব্যয় বহনের জন্য চাপ দিয়েছেন। এছাড়া নিয়মিত অপমান, বডি শেমিং, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর দাবি, তার স্বামী ও স্বামীর পরিবারের সদস্যদের কর্মকাণ্ড যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারার পরিপন্থী।
এ ঘটনায় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষক ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আবেদনপত্রের অনুলিপি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর চেয়ারম্যানের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, এ বিষয়ে শিক্ষক মো.রহমত হোসেনের মুঠোফোনে বুধবার বেলা প্রায় তিনটার দিকে সাংবাদিকদের সাথে কথা হয়। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের মাধ্যমে বিষয়টি আমরা পারিবারিকভাবে মীমাংসার চেষ্টা চালাচ্ছি। তার বিরুদ্ধে উল্লেখিত অভিযোগের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট আমাকে সমাজের কাছে হেয় করার জন্য আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, বিষয়টি খুব দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। আমরা বসে পারিবারিকভাবে সমাধান করে নেব বলে তিনি জানান।
