ঢাকা
১০ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
রাত ৮:১১
logo
প্রকাশিত : জুলাই ১০, ২০২৬

স্বামী নেই ২০ বছর, ছেলে ছেড়ে গেছে ৫ বছর আগে; ভেঙে গেল ৪০ বছরের শেষ আশ্রয়

রমজান আলী, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন কেবলই হারানোর গল্প। একের পর এক দুঃখ, অভাব আর সংগ্রামের মধ্য দিয়েই কেটে গেছে তাঁর জীবন। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাকার আলীর বাড়ির বাসিন্দা নিলু আক্তার (৫৫)। প্রায় ২০ বছর আগে স্বামী মৃত সিরাজুল ইসলাম মারা যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তাঁর কঠিন সংগ্রাম। আর এবার সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় ভেঙে গেছে তাঁর মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়—স্বামীর হাতে প্রায় ৪০ বছর আগে নির্মিত সেই মাটির ঘর।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের পর অতি কষ্টে সামান্য সামর্থ্য দিয়ে সিরাজুল ইসলাম একটি ছোট্ট মাটির ঘর নির্মাণ করেছিলেন। একটি থাকার ঘর ও একটি রান্নাঘর নিয়েই ছিল তাঁদের সুখ-দুঃখের ছোট্ট সংসার। ঘরটি ছিল না পাকা, ছিল না বিলাসবহুল। তবুও সেই ঘরেই জড়িয়ে ছিল চার দশকের অসংখ্য স্মৃতি, হাসি-কান্না, ভালোবাসা আর সংগ্রামের গল্প।

প্রায় ২০ বছর আগে স্বামীর মৃত্যু হলে পুরো সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে নিলু আক্তারের কাঁধে। অভাব-অনটনকে সঙ্গী করে মানুষের বাড়িতে কাজ করেছেন, কখনো না খেয়ে থেকেছেন, কখনো আধপেটা খেয়ে দিন পার করেছেন। তবুও একমাত্র ছেলেকে মানুষ করার চেষ্টা থামাননি। তাঁর একটাই স্বপ্ন ছিল—ছেলে একদিন বড় হবে, আর জীবনের শেষ বয়সে মায়ের পাশে দাঁড়াবে।

কিন্তু সেই স্বপ্নও একসময় ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। প্রায় পাঁচ বছর আগে একমাত্র ছেলে অন্যত্র চলে যায়। এরপর থেকে তিনি মায়ের কোনো খোঁজ-খবর নেন না বলে জানান স্থানীয়রা।

স্বামীহারা, সন্তান থেকেও সন্তানহীন নিলু আক্তার একাই বসবাস করছিলেন সেই পুরোনো মাটির ঘরে। এরই মধ্যে কয়েক বছর আগে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এতে তাঁর এক হাত ও এক পা আংশিক অবশ হয়ে যায়। এখন ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারেন না। আগের মতো মানুষের বাড়িতে কাজ করার শক্তিও আর নেই। অর্থাভাবে নিয়মিত ওষুধ কিনে খেতে পারেন না। অনেক সময় একবেলা খেয়ে দুইবেলা না খেয়েই দিন কাটে তাঁর। অসুস্থ শরীর, নিঃসঙ্গ জীবন আর চরম দারিদ্র্য—সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই তাঁর কাছে এক কঠিন লড়াই।

এরপর সাম্প্রতিক টানা অতিবৃষ্টি ও বন্যা যেন তাঁর জীবনে শেষ আঘাত হয়ে আসে। বন্যার পানির তোড়ে ধসে পড়ে প্রায় ৪০ বছরের সেই মাটির ঘর। মুহূর্তেই হারিয়ে যায় তাঁর মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়। ভাঙা দেয়াল, কাদামাটি আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভাঙা ঘরের দিকে তাকিয়ে নির্বাক হয়ে বসে থাকেন তিনি। চোখের সামনে হারিয়ে যায় জীবনের শেষ সম্বলটুকুও।

স্থানীয় বাসিন্দা মিজান ও ইলিয়াস জানান, নিলু আক্তারের জীবনে দুঃখের যেন শেষ নেই। স্বামী মারা যাওয়ার পর মানুষের বাড়িতে কাজ করে কোনোভাবে জীবন চালিয়েছেন। পরে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে কাজ করার ক্ষমতাও হারিয়েছেন। একমাত্র ছেলেও দীর্ঘদিন ধরে মায়ের কোনো খোঁজ-খবর নেয় না। সর্বশেষ বন্যায় তাঁর শেষ আশ্রয়টুকুও ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন তিনি প্রতিবেশীদের সহায়তায় কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁরা বলেন, "এই মায়ের মাথার ওপর একটি ঘর তুলে দিতে পারলে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় মানবিক কাজ।"

স্থানীয়দের দাবি, নিলু আক্তারের আর কোনো জমা-সম্বল, বিকল্প আশ্রয় বা নিয়মিত আয়ের উৎস নেই। তাই সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, মানবিক সংগঠন এবং দেশ-বিদেশে অবস্থানরত দানশীল মানুষের প্রতি তাঁরা এই অসহায় বিধবা মায়ের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। অনেকের সামান্য সহযোগিতা একত্রিত হলে হয়তো আবারও তাঁর মাথার ওপর একটি নিরাপদ ছাদ তৈরি হবে, আর জীবনের শেষ বয়সে তিনি ফিরে পাবেন একটু স্বস্তি, একটু নিরাপত্তা এবং বেঁচে থাকার নতুন আশা।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram