

গাজী মমিন, ফরিদগঞ্জ (চাঁদপুর) প্রতিনিধি: শিশুদের শরীরে এলার্জি বেড়েছে। ভালো চিকিৎসক হিসেবে সুনাম শুনে হতদরিদ্র পরিবারের সদস্যরা তাদের শিশুদের নিয়ে যায় ওই চিকিৎসকের কাছে। ওই চিকিৎসক শিশুদের শরীরে এলার্জির ইনজেকশন পুশ করেন নিজেই। ফলাফল ভয়াবহ, কিছুদিনের মধ্যেই ইনজেশনের পুশকৃত স্থানগুলো শুকিয়ে গিয়ে পঙ্গুত্বের দিকে যায় শিশুরা। অভিভাবকরা দ্রুত ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ওই শিশুদের নিয়ে গেলেও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন চিকিৎসা সম্ভব নয়। ফলে ভয়ংঙ্কর ভবিষ্যত নিয়ে বিপাকে শিশুদের অভিভাবকরা। বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ইউএনওর নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটিও ঘটনার সত্যতা পেয়েছে। নির্মম এই ঘটনাটি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়নের ফকির বাজার এলাকার। আর কথিত চিকিৎসক হলেন মো.রিয়াজুল হক, যার বাড়ি একই এলাকায়।
সরেজমিনে জানা যায়, ফকির বাজারের জনৈক মো.রিয়াজুল হক ঢাকার এক চিকিৎসকের সহকারী হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে এলাকায় চিকিৎসক বনে যান। শুরু করেন এলাকায় চিকিৎসা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে স্থানীয় লোকজন চিকিৎসা নিতে আসেন। এভাবেই মো. রিয়াজের সুনাম শুনে তার কাছে এলার্জির চিকিৎসা নিতে এসে প্রায় পুঙ্গত্বের শিকার হয়েছেন গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়নের শ্রীকালিয়া গ্রামের গৃহবধূ রোকসানা বেগম, ১৮ মাস বয়সী শিশু আব্দুল আহাদ, ৭ম শ্রেণিতে পড়ুয়া শিশু আশ্রাফুল ইসলাম, মাদ্রাসায় পড়ুুয়া শিশু মো. ইয়াছিনসহ বেশ কয়েকজন।
অপচিকিৎসার শিকার গৃহবধূ রোকসানা বেগম বলেন, গত ৩ মাস আগে আমাদের এলার্জি জনিত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। পরবর্তীতে আমরা ফকির বাজারে গেলে ডাক্তার মো.রিয়াজুল হক আমাকে ও আমার ১৮ মাস বয়সী শিশু সন্তান আব্দুল আহাদকে দুইটি করে ইনজেকশন করে ও ঔষুধ সেবন করতে দেয়। তার দেওয়া ঔষধ সেবনের পর হাতে ব্যথা অনুভব করছি এবং ইনজেকশন দেয়া স্থান শুকিয়ে যেতে লাগে। আমরা পরবর্তীতে তার কাছে গেলে তিনি বলেন, ভিটামিন খেলে ঠিক হয়ে যাবে। এতে আমরা সুস্থ্য না হওয়াতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই ঢাকায়, বড় ডাক্তাররা বলেছে আমাদের হাতগুলো আর ঠিক নাও হতে পারে। আমরা খোঁজখবর নিয়ে দেখছি ডাক্তার মো. রিয়াজুল হক কোন ডিগ্রিধারী ডাক্তার নয়, তিনি আমাদের ভুল চিকিৎসা দেওয়াতে এখন আমরা পঙ্গুত্ববরণ করতে যাচ্ছি। আমরা তার বিচার চাই।
একই অভিযোগ করেন শিশু আশ্রাফুল ইসলামের মা মোহছেনা বেগম, অপর শিশু মো. ইয়াছিনের মা তাহমিনা বেগম ও অপর এক শিশুর অভিভাবক মো. হাসানের। তারা বলেন, পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর জানতে পারি, রিয়াজুল হকের ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে আমাদের শিশুদের হাতের ভেতরে ইনফেকশন হয়ে গেছে। হাতে শক্তি পাচ্ছে না। হাত গুলো অকেজো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে অন্য চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, মো.রিয়াজুল হক স্বীকৃত কোন ডাক্তার না হয়েও তিনি এলাকার সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে বেশ কয়েক বছর যাবত অপচিকিৎসা দিয়ে আসছেন।
গুপ্টি পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান পাটওয়ারী বলেন, মো.রিয়াজুল হকের অপচিকিৎসার শিকার হয়ে স্থানীয়রা অসুস্থ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি সত্য। আমি ইউএনওকে জানিয়েছি।
অভিযোগের বিষয়ে মো. রিয়াজুল হকের সাথে যোগাযোগ করে তার মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আসাদুজ্জামান জুয়েল বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ইনফেকশন হয়ে ভুক্তভোগী শিশুদের হাতের রগ শুকিয়ে গেছে। মাংস সরে গেছে ওই স্থান থেকে। এই ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যেই ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেটু কুমার বড়ুয়া বলেন, অপচিকিৎসার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। গঠিত তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তদন্ত কমিটির রির্পোটের আলোকে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
