

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার: টানা ভারি বর্ষণে কক্সবাজারে পাহাড়ধস, ঘরের দেয়াল ধস ও পানিতে ডুবে গত দুই দিনে অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে আটজন রোহিঙ্গা। অব্যাহত বৃষ্টিপাতে জেলার পাহাড়ঘেরা এলাকায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) পৃথক ঘটনায় কক্সবাজার সদর ও উখিয়ায় আরও দুইজনের মৃত্যু হলে জেলায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ১২ জনে দাঁড়ায়।
মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার সদর উপজেলার দরিয়ানগরের বড়ছড়াপাড়া এলাকায় পাহাড়ধসে নাছিমা আক্তার লিমা (২৭) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার স্বামী জসিম উদ্দিন আহত হয়ে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ ইউনুছ জানান, দুপুরের খাবারের পর স্বামী-স্ত্রী ঘরের ভেতরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এ সময় বাড়ির পেছনের পাহাড় থেকে একটি বড় গাছসহ মাটি ধসে ঘরের ওপর পড়ে। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক নাছিমা আক্তার লিমাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে, একই দিন দুপুরে উখিয়া উপজেলার হলদিয়াপালং ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের জামবাগান এলাকায় টানা বৃষ্টির কারণে ঘরের মাটির দেয়াল ধসে আব্দুল মালেক (৪০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খাবার খাওয়ার সময় দেয়াল ধসে তার ওপর পড়ে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে বিকেল ৫টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ভারি বর্ষণের কারণে মাটির দেয়াল ধসে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতের পরিবারকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
এর আগে সোমবার উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তিনটি পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনায় আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়। একই দিন কক্সবাজার শহর ও পেকুয়ায় পাহাড়ধসে আরও দুইজন নিহত হন। এছাড়া বৃষ্টির পানিতে ডুবে এক রোহিঙ্গাসহ দুই শিশুর মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে গত দুই দিনে জেলায় ১২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আবহাওয়ার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করার জন্য তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, অবৈধভাবে পাহাড় কাটার কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অনেক এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, অবৈধ পাহাড় কাটার ফলে সৃষ্ট মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ও বটে। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ঘটনার পর জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার মাইকিং ও প্রচারণা চালানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে আইন প্রয়োগ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হবে।
ফায়ার সার্ভিসের কক্সবাজার স্টেশনের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, সোমবার থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং মঙ্গলবারও মাইকিং অব্যাহত রয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, সোমবার জেলায় ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত আরও ৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আগামী কয়েক দিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
