ঢাকা
৪ঠা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
বিকাল ৩:৪৭
logo
প্রকাশিত : জুলাই ৪, ২০২৬

‘কালো সোনা’র খোঁজে ওরা

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি এলাকা। খনির ড্রেন থেকে নেমে আসা ময়লা কালচে দূষিত পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন একদল নারী। কারো হাতে বাঁশের চালুনি, কারো হাতে বাঁশ, কারো হাতে ছেঁড়া প্লাস্টিকের বস্তা। তারা প্রত্যেকেই কেউ কোমর, কেউ বুক আবার কেউ বা গলা সমান পানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন। কেউ বাঁশ দিয়ে ড্রেনে খোঁচা মারছেন, কেউ চালুনি দিয়ে কয়লার ময়লা সংগ্রহ করছেন। আবার কেউ পানির নিচে হাত ডুবিয়ে কাদা ও কয়লার ছোট ছোট টুকরো খুঁজে আনছেন। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন তারা পানির ভেতরে হারিয়ে যাওয়া জীবনের শেষ অবলম্বনটুকু খুঁজতে মরিয়া।

আসলেই তা-ই, ময়লা পানি থেকে পাওয়া এই কয়লার গুঁড়াই এখন এ এলাকার বহু পরিবারের একমাত্র আয়ের উত্স। মূলত ভূগর্ভ থেকে কয়লা উত্তোলনের সময় যে ময়লা ও কয়লার গুঁড়া পানির সঙ্গে ভেসে আসে সেটিই সংগ্রহ করেন তারা। স্থানীয়দের কাছে যা ‘কালো সোনা’ নামে পরিচিত। আর সেই ‘কালো সোনা’র খোঁজেই দিনের পর দিন ময়লা পানিতে দাঁড়িয়ে জীবন কাটছে বড়পুকুরিয়ার কয়েক শ নারী। বিশেষ করে কয়লা খনি এলাকার চৌহাটি ও শাহগ্রামের নারীরা প্রায় ২০ বছর ধরে এই কাজ করছেন। একসময় কেউ অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন, কেউ কৃষিকাজে সহায়তা করতেন, কেউ সংসার সামলাতেন। কিন্তু অভাব, স্বামীর অসুস্থতা, সংসারের ভাঙন কিংবা দারিদ্র্যের চাপে একসময় তাদের নামতে হয়েছে এই কালো পানির মধ্যে।

আটটি দল, টানা ২৪ ঘণ্টার শিফট :কয়লার ময়লা সংগ্রহের জন্য বর্তমানে আটটি দল রয়েছে। প্রতিটি দলে প্রায় ৩০ জন নারী সদস্য। তারা পালাক্রমে শিফটে কাজ করেন। একেকটি শিফট শুরু হয় রাত ৮টা থেকে পরদিন রাত ৮টা পর্যন্ত। অর্থাত্ টানা ২৪ ঘণ্টা পানির সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয় তাদের। কয়লার গুঁড়া সংগ্রহের পর একত্র করে শুকিয়ে স্থানীয় ইটভাটা মালিকদের কাছে বিক্রি করা হয়। ভাটা মালিকরা এগুলো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। প্রতি মণ কয়লার গুঁড়ার দাম পাওয়া যায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। বিক্রির পর সদস্যরা গড়ে ভাগ করে পান দিনে প্রায় ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। এই সামান্য টাকাই তাদের সংসারের একমাত্র ভরসা।

‘পানিতে নামি, কারণ ঘরে ক্ষুধা অপেক্ষা করে’:চৌহাটি গ্রামের ফেরদৌসি বেগম। বয়স ৩২। স্বামী সামিদুল ইসলাম। পেশায় কৃষিশ্রমিক। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলের বিয়ে হয়েছে, আর মেয়েটি এখনো পড়াশোনা করছে। ভেজা কাপড় নিংড়াতে নিংড়াতে ফেরদৌসি বলেন, ‘মেয়েটা পড়তে চায়। বই লাগে, কোচিং লাগে, স্কুলে যাতায়াতে ভ্যান ভাড়া লাগে। কিন্তু ঘরে টাকা নাই। স্বামীর আয় দিয়ে সংসারই চলে না। তাই শরীর খারাপ থাকলেও পানিতে নামতে হয়। তিনি জানান, দীর্ঘসময় পানিতে থাকার কারণে হাত-পায়ের চামড়া উঠে গেছে। রাতে শরীর ব্যথায় ঘুম হয় না। তবুও ভোর হলে আবার কাজে ফিরতে হয়।’

৪৫ বছর বয়সি দুলালী বেগম বলেন, ‘প্রায় ১২ বছর ধরে এই কাজ করছেন। প্রথম প্রথম ড্রেনের ঐ কালো পানিতে নামতে ভয় লাগত। পরে বুঝলাম, অভাবের কাছে ভয় বলে কিছু নাই। তার পর থেকে তীব্র শীতেও এই কাজ করেছি। দীর্ঘদিন পানিতে কাজ করতে করতে শরীরে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে। রাতে শরীর চুলকায়, বুক ধরে আসে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।’

৪২ বছর বয়সি কহিনুর বেগম। স্বামী ফরজ আলী সাত বছর আগে মারা গেছেন। সেই সময় পাঁচ সন্তান নিয়ে একেবারে অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। তিন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন অনেক কষ্ট করে। দুই ছেলে এখনো বেকার। কহিনুর বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পরে মনে হয়েছিল, জীবন শেষ। কীভাবে সন্তানগুলারে মানুষ করব বুঝতে পারছিলাম না। এখন এই কাজই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র পথ। এই পানিই এখন আমাদের বাঁচিয়ে রাখছে। আবার এই পানিই শরীরটারে শেষ করে দিচ্ছে।’

অসুস্থ হচ্ছেন অনেকেই :এই কাজ করতে গিয়ে পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন অনেক নারী। কয়লার গুঁড়ার সঙ্গে থাকা কার্বন ও ক্ষতিকর পদার্থ শরীরে ঢুকে নানা জটিল রোগ তৈরি করছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে এই কাজে যুক্ত ছিলেন এমন অনেক নারী অসুস্থ হয়ে গেছেন। তাদের শরীরে বাসা বেঁধেছে অনেক রোগ। কেউ কেউ শয্যাশায়ী। আবার কেউ অসুস্থ হয়ে এই কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় গেছেন। এরপরও নতুন নতুন নারী এই কাজে আসছেন। কারণ অভাব তাদের সামনে অন্য কোনো পথ খোলা রাখেনি।

স্থানীয় চিকিত্সকদের ভাষ্য, ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত এই কয়লা পানির সঙ্গে কয়লার সূক্ষ্ম কণা ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান মিশে যায়। দীর্ঘদিন এই পানির সংস্পর্শে থাকলে ত্বক, ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এসব নারীদের অনেকেই এখনো নিয়মিত চিকিত্সাসেবার বাইরে আছেন। যার ফলে ছোটখাটো অসুস্থতাও দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই তাদেরকে চিকিত্সাসেবার আওতায় আনতে হবে। তাদেরকে এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।

খনি বন্ধ মানেই ঘরে অভাব :যখন ভূগর্ভ থেকে কয়লা উত্তোলন বন্ধ থাকে, তখন এই নারীদের আয়ও বন্ধ হয়ে যায়। কারণ তখন ড্রেনের পানিতে কয়লার গুঁড়া আসে না। যার ফলে বেকার হয়ে অবসর সময় পার করেন তারা। নারীরা জানান, খনি বন্ধ মানেই আমাদের ঘরে হাহাকার, দুঃশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা। তখন ধার করে চলতে হয়। অনেক সময় ঠিকমতো খাবারও জোটে না।

স্থানীয় সমাজকর্মীরা জানান, এটি কেবল দারিদ্র্যের গল্প নয়, বরং অনানুষ্ঠানিক শ্রমব্যবস্থার একটি কঠিন বাস্তবতা। যেখানে কেবল সামান্য আয়ের জন্য এসব নারী অনেক ঝুঁকি নিচ্ছেন। এলাকায় নিরাপদ কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষ বাধ্য হচ্ছেন এত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে। তাই শুধু সহানুভূতি নয়, এই নারীদের জীবিকা নির্বাহের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

সর্বশেষ
logo
প্রকাশকঃ অধ্যাপক ড. জোবায়ের আলম
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ এডভোকেট মো: গোলাম সরোয়ার
কার্যালয় : বিটিটিসি বিল্ডিং (লেভেল:০৩), ২৭০/বি, তেজগাঁও (আই/এ), ঢাকা-১২০৮
মোবাইল: +88 02-226603507, +88 02-226603508, +880 1713 037 345, +880 1300 126 624
ইমেইল: tbtbangla@gmail.com (online), ads@thebangladeshtoday.com (adv) newsbangla@thebangladeshtoday.com (Print)
বাংলাদেশ টুডে কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বে-আইনী।
Copyright © 2026 The Bangladesh Today. All Rights Reserved.
Host by
linkedin facebook pinterest youtube rss twitter instagram facebook-blank rss-blank linkedin-blank pinterest youtube twitter instagram