

মোঃ সাগর মল্লিক, ফকিরহাট (বাগেরহাট) প্রতিনিধি: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম রপ্তানিমুখী চিংড়ি শিল্প রেণু পোনার তীব্র সংকটে চরম চাপের মুখে পড়েছে। প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু পোনা আহরণ, পরিবহন ও বেচাকেনার ওপর সরকারের নিষেধাজ্ঞা, হ্যাচারি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিদেশ থেকে পোনা আমদানির জটিলতার কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় উৎপাদন, বাজার, কর্মসংস্থান ও ফকিরহাট উপজেলার লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার ওপর।
ফকিরহাট সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য মতে, উপজেলায় বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে নিবন্ধিত ৮ হাজার ৪টি ঘের ও ২ হাজার ৬০৮টি পুকুর রয়েছে। যেখানে বছরে প্রায় ৪ কোটি ২৬ লাখ বাগদা ও ৭ কোটি ৪৬ লাখ গলদা রেণু পোনার (মোট ১১ কোটি ৭২ লাখ) চাহিদা রয়েছে। তবে স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, বাস্তবে ঘেরের সংখ্যা ও উৎপাদন কাঠামো বিবেচনায় এই চাহিদা মৎস্য বিভাগের হিসাবের চেয়ে প্রায় চারগুণ বেশি। উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী কেন্দুয়া ও কোদলার বিল মিলিয়ে ঘেরের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার, যেখানে চলতি মৌসুমে রেণু পোনার চাহিদা প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি। এপ্রিল-মে-জুন—এই তিন মাস ঘেরে রেণু পোনা ছাড়ার মূল মৌসুম হলেও, ইতোমধ্যে দুই মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। কিন্তু চাষিরা চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ রেণু পোনা সংগ্রহ করতে পেরেছেন। মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হ্যাচারি পোনার সরবরাহ চাহিদার তুলনায় মাত্র ৮ শতাংশ।
উপজেলা মৎস্য চাষি সমিতির তথ্য মতে, স্থানীয় ফলতিতা বাজারের অর্ধ সহস্রাধিক মাছের আড়তে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩ কোটি টাকার মাছ বেচাকেনা হয় এবং বছরের প্রায় ১০ মাস এই কেনাবেচা চলে। এই বাজারের শ্রমিক ও পরিবহন ব্যবস্থাকে ঘিরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এছাড়া উপজেলার প্রায় ২০ হাজার বাণিজ্যিক ঘের ও পুকুরে মাছ চাষের সাথে আরও লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।
ঠিকরিপাড়া এলাকার প্রান্তিক চাষি দাউদ হায়দার বাবু ফকির জানান, বর্গা জমির হারি, মাটি কাটা, চুন, ব্লিচিং, ওষুধ ও শ্রমিক মজুরিসহ এক একর ঘের প্রস্তুত করতে তার প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রতি বছর ১ লাখ ২০ হাজার পোনা ছাড়লেও, এবার মৌসুমের শেষ সময়ে এসে মাত্র ১৮ হাজার পোনা সংগ্রহ করতে পেরেছেন। ঋণ নিয়ে ঘের প্রস্তুত করে মাছ ছাড়তে না পারায় তিনি এখন দিশেহারা। অনুরূপ সংকটের কথা জানান পিলজংগ এলাকার চাষি শওকত আলী। এপ্রিল মাসে ঘের প্রস্তুত করে রাখলেও ১৫ জুন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পোনা পাননি তিনি। এরই মধ্যে বর্ষার বৃষ্টিতে তার ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে এবং মৌসুম শেষ হয়ে আসায় তিনি আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
নলধা, গাবখালী ও কাঁঠালতলার প্রবীণ চাষি নজরুল সর্দার, হাফিজুর রহমান ও কামরুল মোড়ল জানান, হ্যাচারির পোনার তুলনায় প্রাকৃতিক পোনার বেঁচে থাকার হার বেশি এবং উৎপাদিত চিংড়ির গুণগত মান ভালো হয়। তাদের দাবি, হ্যাচারির পোনা মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ টিকে থাকে, যেখানে প্রাকৃতিক পোনার ক্ষেত্রে তা প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলে প্রাকৃতিক পোনা তাদের কাছে বেশি লাভজনক।
এদিকে আড়তদার শেখ মনি জানান, বাজারে পোনার দাম গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত বছর প্রতি হাজার পোনা ১,৩০০ থেকে ১,৭০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার তা ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকায় পৌঁছেছে। কুমিল্লা ও নোয়াখালীর সরবরাহকারীদের কাছে তার অগ্রিম দেওয়া প্রায় ৭৮ লাখ টাকার দাদন আটকে আছে, কিন্তু এখনো রেণু পোনা মেলেনি।
ফকিরহাট প্রাকৃতিক চিংড়ি পোনা আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি নুরুল ইসলাম খোকন জানান, স্থানীয় পর্যায়ে পোনা না থাকায় তারা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনার নদী-সমুদ্র এবং সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আসা বাগদা ও রেণু পোনার ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু এগুলো পরিবহন ও সংগ্রহের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জব্দ ও আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। চলতি মৌসুমে উপকূলীয় ও সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আসা কয়েক কোটি রেণু পোনা জব্দ হওয়ায় ব্যবসায়ী ও পিএল নার্সিং পয়েন্টের মালিকদের বিপুল অঙ্কের ক্ষতি হয়েছে। চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, এই পদ্ধতিকে নিয়ন্ত্রিত ও বৈধ কাঠামোর মধ্যে আনা হলে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং দেশীয় উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে।
মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ফকিরহাটে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ২,৩১৫ মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদন হয়েছিল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২,৪৩০ মেট্রিক টন। তবে চাষিদের মতে, বর্তমান রেণু পোনা সংকট থেকে উত্তরণ না হলে এই কাগুজে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না, বরং উৎপাদনে বড় ধস নামবে। তারা জানান, যেহেতু তারা সরাসরি মাছ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত, তাই মৎস্য বিভাগের উচিত চাষিদের সাথে কথা বলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা। বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে মিল না রেখে মৎস্য অফিসের কাগুজে রিপোর্ট তৈরি করা নিয়ে চাষিরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। চাষিদের দাবি, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ২০ শতাংশও অর্জন করা সম্ভব হবে না।
বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এইচএম রাকিবুল ইসলাম জানান, মান নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে ২০১১-১২ সালের ৭৮টি হ্যাচারির স্থলে ২০২৫-২৬ সালে তা ৩৭টিতে নেমে এসেছে। রেণু পোনার নিম্নমান সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকারি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিকদের এসব বেসরকারি হ্যাচারির মান নিয়ন্ত্রণ বা সরাসরি ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো আইনগত ক্ষমতা নেই। তবে হ্যাচারি মালিকরা কারিগরি সহায়তা চাইলে তা দেওয়া সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, হ্যাচারিতে নিয়ন্ত্রিতভাবে উৎপাদিত পোনা ঘেরে ছাড়ার পর প্রাকৃতিক পোনার তুলনায় অভিযোজন সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম থাকে, যার কারণে চাষিদের প্রাকৃতিক পোনার প্রতি আগ্রহ বেশি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে নদী থেকে একটি রেণু পোনা সংগ্রহের সময় অসচেতনতার কারণে পাত্রের পানি তীরে ফেলে দেওয়ায় অসংখ্য অন্যান্য মাছের পোনা মারা যায়, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই কারণেই সরকার প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু পোনা আহরণ নিষিদ্ধ করেছে।
ফকিরহাট সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ আসাদুল্লাহ বলেন, "প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে রেণু পোনা আহরণ ও বিক্রি আইনত নিষিদ্ধ হওয়ায় অভিযান চালানো হচ্ছে।" তিনি জানান, তারা চাষিদের হ্যাচারি পোনার ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহিত করছেন, তবে বর্তমানে এর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় মাত্র ৮ শতাংশ।
